কেন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের ইরান চুক্তি ভেঙে দিতে চান
সামি আল-আরিয়ান
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ২০:২৪
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবং অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন না। তিনি পাশবিক শক্তি, স্থায়ী উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং মনগড়া সংকটের মাধ্যমে সেগুলোকে চূর্ণবিচূর্ণ করার চেষ্টা করেন। তার পুরো কর্মজীবনে ইসরায়েলি আধিপত্য এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করেছেন। তিনি একে পছন্দের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত করে আসছেন।
অতি সম্প্রতি তার অগ্রাধিকার হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে একটি প্রায়-সম্পূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রাখা। যদি কূটনীতি সফল হয়, তবে তিনি এটিকে বানচাল করার জন্য প্রতিটি রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, সংবাদমাধ্যম ও লবিং কৌশল ব্যবহার করবেন।
তিনি যা ‘পরিপূর্ণ বিজয়’ বলেন, সেই বিজয়ের প্রতি তার মোহ এতই কঠোর যে- তিনি কোনো আপসকে মেনে নিতে পারেন না। তার কাছে কোনো বন্দেবস্তই গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না তার মাধ্যমে গাজায় হামাস ও ইসলামিক জিহাদকে নিরস্ত্র করা হয়, এবং সবকিছু যাতে নিষ্ক্রিয় করা হয় অথবা খোদ ইরান রাষ্ট্রকে নিষ্ক্রিয় বা বন্দী করা হয়। তার লক্ষ্য- শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়; বরং সব প্রতিরোধের অবসান এবং মার্কিন সুরক্ষায় ইসরায়েলি আধিপত্যের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত একটি অঞ্চল।
গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ইরানজুড়ে যুদ্ধগুলো কখনোই বিচ্ছিন্ন সংঘাত ছিল না। এগুলো ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলি আঞ্চলিক আধিপত্য সুসংহত করার একটি একক অভিযানের অংশ। নেতানিয়াহু জানেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও এই লক্ষ্যগুলো অপূর্ণই রয়ে গেছে। এই ব্যর্থতা তাকে নতুন করে ভাবার সুযোগ না দিয়ে বরং এই বিশ্বাসে উপনীত করেছে যে, সমস্যাটি লক্ষ্যগুলোর মধ্যে নয়, বরং শক্তির অপর্যাপ্ত প্রয়োগের কারণে।
তার কাছে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। আজ শক্তি প্রয়োগ করে যা অর্জন করা যায়নি, আগামীকাল তা আরও ব্যাপক সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে। ইরানের সঙ্গে পূর্ববর্তী সংঘাতে ট্রাম্পকে জড়িয়ে ফেলার পর নেতানিয়াহু এখন নিশ্চিত যে, তিনি আবারও সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। এবার তার লক্ষ্য সীমিত হামলার সীমা ছাড়িয়ে এমন এক চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে।
জানা গেছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং বেশ কয়েকটি আরব ও ইসলামী রাষ্ট্রের সমর্থনে চলমান আলোচনা একটি প্রায়-চূড়ান্ত কাঠামো তৈরি করেছে। এর মূলে রয়েছে বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে সম্প্রসারণ করে লেবাননসহ অন্তত ৬০ দিনের জন্য একাধিক রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি অস্থিতিশীলতা এবং উত্তর আমেরিকায় আসন্ন বিশ্বকাপের মতো অনুষ্ঠান ব্যাহত করতে পারে। সুতরাং এমন একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কায় ওয়াশিংটনের শান্তি প্রয়োজন। এই পশ্চাদপসরণ কোনো বিজয়ের ফল নয়, বরং এটি একটি বাধ্যবাধকতা।
যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে অঞ্চলটিকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল সুরক্ষিত করা, ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, জব্দকৃত ইরানি সম্পদে আংশিক প্রবেশাধিকার দেওয়া এবং বৃহত্তর স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু করা। আর্থিক ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোতে ভিন্নতা রয়েছে, যার প্রাথমিক অংক ১২ বিলিয়ন থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। যদিও এর বিস্তারিত বিবরণ এখনও পরিবর্তনশীল।
অঞ্চলটি এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একটি পথ পারস্পরিক ক্লান্তি এবং ক্ষমতার পালাবদলের ফলে সৃষ্ট একটি অসম্পূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগের দ্বার উন্মোচন করে; অন্যটি এমন এক বৃহত্তর সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়, যা ওয়াশিংটন বা তেল আবিব কারোরই নিয়ন্ত্রণে নেই।
এটা ধরে নেওয়া এক বিপজ্জনক ভ্রান্তি যে, নেতানিয়াহু তার মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি নীরবে মেনে নেবেন। কিন্তু এর চেয়েও গভীর ভ্রান্তি হলো এই বিশ্বাস যে, পাশবিক শক্তি দিয়ে এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব, যার রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তিগুলো ভেঙে পড়ছে।
আদর্শগত মোহ এবং কৌশলগত ব্যর্থতার মাঝে আটকা পড়ে নেতানিয়াহু হয়তো শেষবারের মতো একটি মারাত্মক জুয়া খেলতে পারেন। এছাড়া তিনি যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে পারেন, যতক্ষণ না পুরো কাঠামোটিই ভেঙে পড়ে।
ইস্তাম্বুল জাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের (সিআইজিএ) পরিচালক। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর করেছেন ইফতেখারুল ইসলাম।
- বিষয় :
- ইসরায়েল
- নেতানিয়াহু
- ট্রাম্প
