অর্থনীতি
এলডিসি উত্তরণের বাড়তি সময় ব্যয় হোক সংস্কার ও প্রস্তুতিতে
আব্দুর রাজ্জাক
আব্দুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১৫:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বস্তির বিষয়। পূর্ববর্তী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ২৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে হওয়ার কথা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এ প্রক্রিয়া জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়ার নীতি অনুসরণ করেছিল। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অংশীজন এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে বলতে থাকেন, এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনও সম্পন্ন হয়নি; উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও মেয়াদের শেষ দিকে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রবিষয়ক দপ্তর (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস)-কে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পর্কে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন পরিচালনার অনুরোধ জানায়। ইউএন-ওএইচআরএলএলএস তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে নিবিড় পরামর্শের মাধ্যমে মূল্যায়নটি সম্পন্ন করে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি এবং বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়ে পড়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য কমাতে দেশের দীর্ঘদিনের অর্জনের আংশিক বিপর্যয়, ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকট, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্বসংক্রান্ত চাপসহ নানা কাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়। পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করায় এসব উদ্বেগ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকারও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের সময় বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘকে অনুরোধ জানায়।
ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘গ্র্যাজুয়েশন কোয়ালিফিকেশন’ (উত্তরণের যোগ্যতা) এবং ‘গ্র্যাজুয়েশন প্রিপেয়ার্ডনেস’ (উত্তরণের প্রস্তুতি)-এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরা। অর্থাৎ কোনো দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সূচক পূরণ করেছে কিনা, সেটি এক বিষয়; আর উত্তরণের ফলে সম্ভাব্য অভিঘাত মোকাবিলা করে টেকসইভাবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য দেশটি বাস্তবে কতটা প্রস্তুত, সেটি আরেক বিষয়। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়, জাতিসংঘ ব্যবস্থার লক্ষ্য এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করা যে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জের কারণে কোনো দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয়ে পড়বে না। ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের পাওয়া ফলের সঙ্গে সিডিপির পর্যবেক্ষণেরও যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন যে যুক্তিসংগত এবং বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজনীয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
সিডিপির মূল্যায়ন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে। প্রথমত, বাংলাদেশ এখনও এলডিসি উত্তরণের সব সূচকে প্রয়োজনীয় সীমারেখার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ দেশের উত্তরণের যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছরে কভিড-পরবর্তী অভিঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মতো নানা ঘটনা এলডিসি-পরবর্তী প্রস্তুতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়নকে ধীর করেছে। ফলে প্রস্তুতির জন্য কিছু অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
তবে সিডিপির সুপারিশই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। পরবর্তী ধাপ হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সমর্থন অর্জন করা। কাজেই বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্রকে বোঝাতে হবে যে অতিরিক্ত সময় চাওয়ার উদ্দেশ্য উত্তরণ এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। উন্নয়ন অংশীদার, বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটগুলোর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ অপরিহার্য হবে।
কিন্তু এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানো কোনোভাবেই এমন একটি দরকষাকষির উপকরণে পরিণত হওয়া উচিত নয়, যার বিনিময়ে বড় শক্তিগুলোর কাছে ব্যয়বহুল রাজনৈতিক বা কৌশলগত ছাড় দিতে হয়। এ কারণে বিষয়টিকে উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করাই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল।
সিডিপির সুপারিশ বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে বটে, কিন্তু এটিকে অবকাশ হিসেবে দেখা যাবে না। তিন বছর শুনতে দীর্ঘ মনে হলেও বাস্তবে তা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কাজেই এখনই অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নির্ধারণ জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক পণ্যের বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করছে; উত্তরণের পর তা থাকবে না। জিএসপি প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমান সুবিধা ধরে রাখা যাবে মনে করা হলেও বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। পোশাক খাতের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ইতোমধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে বড় হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হবে না। ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয়েছে এবং ভারতের সঙ্গেও তা হতে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ আগের তুলনায় আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের হলেও অগ্রগতি খুবই সীমিত। বাংলাদেশের অনেক শিল্প দেশের বাজারে ভালো অবস্থান তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাদের সংযোগ এখনও দুর্বল। শুধু উৎপাদন করলেই রপ্তানিতে সাফল্য আসে না। এর জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণ, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তি, নকশা, ব্র্যান্ডিং এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হয়। বিদেশি বিনিয়োগ সাধারণত এসব গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ও সক্ষমতা একসঙ্গে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
দ্রুত রপ্তানি বহুমুখীকরণে সফল দেশগুলো কেবল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভর করেনি। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের শিল্পকে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশকে এখন মৌলিক পরিষেবার সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণকারী সম্ভাব্য সব সুযোগসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে হবে। বড় বহুজাতিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করতে প্রয়োজন হলে উদার কিন্তু সুপরিকল্পিত প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখন এক বা দুই দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। শ্রমশক্তি, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, দীর্ঘদিনের রপ্তানি অভিজ্ঞতা এবং এশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
আশ্চর্যের বিষয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার স্থগিত রেখে রপ্তানি সহায়তা কমানোর পদক্ষেপ তুলনামূলক দ্রুত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত সময়ের সাফল্য মূলত নির্ভর করবে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি বাস্তবায়ন সক্ষমতা জোরদার করা ছাড়া কোনো কৌশলই টেকসই ফল দেবে না। সরকারের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ চলছে। এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকে এ উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারার অংশ করতে হবে।
বহু বছর ধরে বাংলাদেশ নিজেকে একটি সংস্কারমুখী ও দ্রুত অভিযোজিত অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং অত্যন্ত পরিশীলিত পরিকল্পনা, কৌশলপত্র ও রোডম্যাপ প্রণয়নের সক্ষমতা প্রশংসিত হলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা আমাদের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এলডিসি থেকে সফল ও গতিশীল উত্তরণের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি শক্তিশালী বাস্তবায়ন-সংস্কৃতি গড়ে তোলা। তবে তা অর্জন সম্ভব হবে কেবল দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর সংস্কার এবং দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সময় বাড়ানো আমাদের জন্য সুযোগ, কিন্তু তাকে উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সোপানে রূপান্তর করার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই।
ড. আব্দুর রাজ্জাক: অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, র্যাপিড
[email protected]।
- বিষয় :
- আব্দুর রাজ্জাক
