ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

ডেঙ্গুর আগাম সতর্কবার্তা

কথা নহে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

কথা নহে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি এবং প্রাণহানি এখন গোটা বৎসরই পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করিয়া বর্ষায় ইহার প্রকোপ বাড়িয়া যাইবার কারণে ইতঃপূর্বে প্রাণহানিও ঘটিয়াছে ব্যাপকভাবে। এইবারের লক্ষণও যে স্বস্তিদায়ক নহে, ডেঙ্গুসংক্রান্ত প্রাক-বর্ষা জরিপের ফল সেই ইঙ্গিতই দিয়াছে। শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তথা ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩-তেই এডিস মশার ঘনত্ব স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি। তাহার মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে প্রাণঘাতী এই রোগের এহেন বিস্তারের আশঙ্কা যথেষ্ট উদ্বেগজনকই বটে। বলা বাহুল্য, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশার আবাসস্থল হিসাবে ডিএসসিসির এই চিত্র ডিএনসিসি বা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিস্থিতি সম্পর্কেও স্বস্তি দেয় না। যথাযথ জরিপ হইলে সেখানেও প্রায় কাছাকাছি চিত্র মিলিতে পারে। উপরন্তু দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার অবস্থাও তথৈবচ হওয়ার কথা, সাধারণত ঐ সকল শহরাঞ্চলে জনঘনত্ব যদ্রূপ বেশি, তদ্রূপ মশকের আবাসস্থলরূপী জলাধারসমূহও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। স্মরণ করা যাইতে পারে, গত বৎসর বরগুনা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছিল এবং উহা এডিস মশার অন্যতম হটস্পট হিসাবে চিহ্নিত হইয়াছিল। বস্তুত সমগ্র বরিশাল অঞ্চলেই সেই পরিস্থিতি ভয়ানক ভোগান্তি সৃষ্টি করিয়াছিল।

এমন সময়ে ডেঙ্গুর এই পরিস্থিতি জানা যাইতেছে যখন প্রায় সারাদেশেই হামের প্রকোপে শিশুরা নাজেহাল। ইতিমধ্যে হাম ও ইহার উপসর্গে আক্রান্ত হইয়া ছয় শতাধিক শিশুর প্রাণহানি ঘটিয়াছে। সরকারের সাম্প্রতিক হামের টিকা কর্মসূচির পরও প্রকোপ কমিতেছে না। ইহার মধ্যে ডেঙ্গু বিস্তারের ইঙ্গিত ভয়াবহতারই লক্ষণ। ডেঙ্গু রোগে চলতি বৎসর অদ্যাবধি সাড়ে তিন সহস্র আক্রান্ত হইয়াছে,  মৃত্যুবরণ করিয়াছে ছয়জন। হামের প্রকোপের মধ্যে যদি সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করিতে না পারে, তবে তাহা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকির কারণ হইবে। 

ডিএসসিসি প্রশাসক উক্ত জরিপের উপর ভিত্তি করিয়া আগামীকাল ৭ জুন হইতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে ‘বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করিবেন বলিয়া জানাইয়াছেন। এই ঘোষণা যেন কথার কথা না হয়, উহা নিশ্চিত করিতে হইবে। কেবল ঢাকায় নহে, সমগ্র দেশেই ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকিতে হইবে। দেশে প্রথম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। বিগত আড়াই দশকে ডেঙ্গুসংক্রান্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইয়া এবং জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শকে মূল্য দিয়া উপযুক্ত প্রতিকার ও প্রতিরোধ কার্যক্রম সংগৃহীত হইলে পরিস্থিতি লইয়া উদ্বেগের কোনো প্রয়োজন থাকিত না। ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুর ও ভারতের ন্যায় এশিয়ারই বিভিন্ন দেশ এই ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্যও অর্জন করিয়াছে। অন্যদিকে বিশেষত ২০১৯ সাল হইতে দেশে প্রতিবৎসর ডেঙ্গু রোগে মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপকতা পাইয়াছে। ঐ বৎসর ১৭৯ জন মারা যান, আর ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়। তখন তিন লক্ষ ২১ সহস্রাধিক ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, আর মৃত্যু হয় এক সহস্র ৭০৫ জনের। 

ডিএসসিসির প্রশাসক যথার্থই বলিয়াছেন যে, কেবল সরকারি উদ্যোগ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নহে। তিনি নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তথা বাসাবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখা এবং প্রতি তিন দিন অন্তর জমে থাকা পানি অপসারণের আহ্বান জানাইয়াছেন। কিন্তু এই জনমত গড়িয়া তুলিবার ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা অগ্রগণ্য। গত বৎসর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়া চার শতাধিক মানুষ প্রাণ হারাইয়াছে। নিয়ন্ত্রণযোগ্য এই রোগে আর মৃত্যু আমরা দেখিতে চাই না। তাই সংশ্লিষ্ট সকলকে যুক্ত করিয়া ডেঙ্গু নির্মূলের সাঁড়াশি অভিযান জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। 
 

আরও পড়ুন

×