ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

নারীর স্বাস্থ্য, অপুষ্টি, হাম: মৃত্যুর জেন্ডার চক্র

নারীর স্বাস্থ্য, অপুষ্টি, হাম: মৃত্যুর জেন্ডার চক্র
×

ফারহানা হাফিজ ও সাবিনা পারভীন

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে চলতি বছরের হাম প্রাদুর্ভাব এখন গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৪ জুন পর্যন্ত দেশে ৮১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ছয়শর বেশি শিশু মারা গেছে। আক্রান্তদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবার, বস্তি, চরাঞ্চল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশু।

গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৮১ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে এবং বড় একটি অংশ হামের টিকা পায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটকে শুধু টিকাদান ঘাটতির ফল হিসেবে দেখলে বাস্তবতার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের অনেকেই আগে থেকেই অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, কম ওজন ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মধ্যে বেড়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় জনপরিসরে কিছু পরিচিত ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। কেউ বলছেন, ‘মায়েরা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না’, কেউ ‘ফিগার সচেতনতা’-কে দায়ী করছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো শুধু নারীকেই দায়ী করে, সমস্যার গভীর সামাজিক বাস্তবতাকে আড়াল করে। কারণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের কতজন মা নিজের শরীর, পুষ্টি, মাতৃত্ব বা স্বাস্থ্য নিয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? একজন মা যদি নিজেই অপুষ্টিতে ভোগেন, বাল্যবিয়ের শিকার হন, রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত থাকেন কিংবা গৃহস্থালি সহিংসতার মধ্যে জীবনযাপন করেন, তাহলে তাঁর সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে শক্তিশালী হবে?
বাংলাদেশে হাম প্রাদুর্ভাব আসলে শুধু টিকার ঘাটতির গল্প নয়; এটি আন্তঃপ্রজন্ম অপুষ্টি, জেন্ডার বৈষম্য, বাল্যবিয়ে এবং নারীর স্বাস্থ্য অধিকার সংকটেরও গল্প।

শিশু অপুষ্টির বাস্তবতা: দুর্বল শরীর, দুর্বল ইমিউনিটি
বাংলাদেশ গত দুই দশকে অপুষ্টি কমাতে কিছু অগ্রগতি অর্জন করলেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে ২৪ শতাংশ খর্বাকৃতির (স্টান্টেড), ১২.৯ শতাংশ ক্ষীণকায় (ওয়েস্টেড) এবং ২৩ শতাংশ কম ওজনের। আরও উদ্বেগজনক হলো, ৬৪.৮ শতাংশ শিশু ‘চাইল্ড ফুড পোভার্টি’-তে ভুগছে, অর্থাৎ তারা ন্যূনতম বৈচিত্র্যময় পুষ্টিকর খাবারও পাচ্ছে না।

১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৪৩.৯ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। দরিদ্র পরিবার, শহুরে বস্তি, নদীভাঙন এলাকা, চা-বাগান অঞ্চল কিংবা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই হার আরও বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিশু জন্ম থেকেই দুর্বল পুষ্টিগত ভিত্তির ওপর বড় হচ্ছে।
এই অপুষ্টির সরাসরি প্রভাব পড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। হামের মতো সংক্রামক রোগ তখন শুধু একটি ভাইরাস সংক্রমণ থাকে না; এটি দুর্বল শরীরের জন্য জীবনসংকটে পরিণত হয়। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি, কম ওজন, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি–সব মিলিয়ে শিশুর শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে পারে না।

হাম কেন দরিদ্র পরিবারের শিশুকে বেশি আক্রান্ত করছে
সাম্প্রতিক হাম প্রাদুর্ভাবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর শিশু। কারণ দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রবেশাধিকার একসঙ্গে কাজ করে। ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আর অপুষ্ট শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে টিকতে পারে না।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য আলোচনায় এখনও ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-কে শুধু টিকাদান ঘাটতির সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। অথচ বাস্তবে এই ইমিউনিটি গ্যাপ সৃষ্টি হয় মাতৃপুষ্টি, দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে এবং জেন্ডার বৈষম্যের দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

‘মায়েরা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না’–এই ব্যাখ্যার রাজনৈতিক সমস্যা
বাংলাদেশে এখনও মাত্র ৫৬.৬ শতাংশ শিশু ছয় মাস পর্যন্ত একচেটিয়া বুকের দুধ পায়। এ তথ্যকে কেন্দ্র করে যখন বলা হয় ‘মায়েরা সচেতন নন’ বা ‘ফিগার সচেতনতা বেড়েছে’, তখন সমস্যার গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়।

বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নারী নিজেই অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতায় ভোগেন; অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ৫৩ শতাংশের বেশি অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত। অনেক নিম্নআয়ের নারী সন্তান জন্মের অল্পদিন পরই জীবিকার তাগিদে কাজে ফিরতে বাধ্য হন, অথচ পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্তন্যদানবান্ধব কর্মপরিবেশ বা স্বাস্থ্যসেবা পান না। আবার ঘরে থাকা নারীরাও প্রসব-পরবর্তী বিশ্রাম পান না; দ্রুতই তাদের গৃহস্থালি ও পরিচর্যার দায়িত্বে ফিরে যেতে হয়।

ফলে মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যা বুকের দুধ খাওয়ানো, শিশুর পুষ্টি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে অবিরাম কাজের চাপ অনেক মায়ের জন্য সন্তানের টিকাদানের সময়সূচি অনুসরণ করাও কঠিন করে তোলে।
অতএব, সমস্যাটি নারীর ‘ইচ্ছা’ বা ‘ফিগার সচেতনতা’র নয়; বরং অপুষ্টি, দারিদ্র্য, শ্রমের চাপ, সহিংসতা এবং নারীর সীমিত সামাজিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

মাতৃপুষ্টি ও শিশুর ইমিউনিটির গভীর সম্পর্ক
একজন মায়ের শরীরই শিশুর প্রথম ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। অতএব গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টিগত অবস্থা সরাসরি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অপুষ্ট মা কম ওজনের শিশুর জন্ম দেওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন, আর এসব শিশুর সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলক দুর্বল হয়।
বাংলাদেশে এখনও প্রায় ১৫ শতাংশ শিশুর জন্ম হয় কম ওজন নিয়ে। কিশোরী মাতৃত্ব, ঘন ঘন গর্ভধারণ, রক্তস্বল্পতা, অপর্যাপ্ত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্তঃসত্ত্বাকালীন পুষ্টির ঘাটতি এ ঝুঁকি আরও বাড়ায়। ফলে অনেক শিশুই জন্ম থেকেই স্বাস্থ্যগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে।

এ অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে পুষ্টিকর খাদ্যের সীমিত প্রাপ্যতা। বাংলাদেশে প্রাণিজ আমিষ গ্রহণের হার বছরে মাথাপিছু মাত্র ৪.৩ কেজি, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বনিম্ন। ফলে দরিদ্র পরিবারের অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতএব, শিশুর ইমিউনিটি শুধু টিকার মাধ্যমে তৈরি হয় না; এর ভিত্তি গড়ে ওঠে মায়ের শরীর ও পুষ্টির ওপর। একজন নারী যদি কৈশোর থেকেই অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যবঞ্চনার মধ্যে থাকেন, তবে তাঁর সন্তানের স্বাস্থ্যও দুর্বল ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।

বাল্যবিয়ে: আন্তঃপ্রজন্ম অপুষ্টির কারখানা
বাংলাদেশে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৭ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি অন্যতম উচ্চহার। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীর বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে, তাদের সন্তানদের মধ্যে খর্বাকৃতি, কম ওজন ও ক্ষীণকায় হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কারণ কৈশোরে শরীরের নিজস্ব বৃদ্ধি সম্পন্ন হওয়ার আগেই অন্তঃসত্ত্বা হলে মা ও শিশু উভয়েই পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত হয়।

এই চক্রই আসলে আন্তঃপ্রজন্ম অপুষ্টি। অপুষ্ট মা থেকে অপুষ্ট শিশু এবং সেই শিশু দারিদ্র্য ও দুর্বল স্বাস্থ্যের মধ্যে বড় হয়। পাশাপাশি অল্প বয়সে মাতৃত্বের কারণে অনেক মায়ের মধ্যে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও সক্ষমতা গড়ে ওঠে না।
হামে মৃত্যুবরণ করা শিশুদের বড় অংশই দরিদ্র, বস্তি ও গ্রামীণ এলাকার, যেখানে বাল্যবিয়ের হার বেশি। ফলে এই সামাজিক বাস্তবতা সরাসরি শিশুর অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

জেন্ডার সহিংসতা ও নারীর সিদ্ধান্তহীনতা
বাংলাদেশে নারীর স্বাস্থ্য সংকটকে পারিবারিক ক্ষমতার সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। এখনও বহু নারী নিজের খাবার, চিকিৎসা, গর্ভধারণ বা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। গৃহস্থালি সহিংসতা, মানসিক চাপ এবং খাদ্য বঞ্চনা নারীর পুষ্টিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

সহিংস পরিবেশে বসবাসকারী নারীরা প্রায়ই পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন যত্ন নিতে পারেন না, সন্তানকে দীর্ঘ সময় বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না কিংবা নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার সুযোগ পান না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুর শারীরিক বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং গত ১২ মাসে এ হার ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ।

অনেক পরিবারে নারীরা সবার খাওয়া শেষ হওয়ার পর খাবার গ্রহণ করেন। এটি এক ধরনের সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যে পরিবারে সহিংসতা বিদ্যমান, সেখানে এই প্রবণতা আরও বেশি লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু এসব পরিবারে নারীর প্রতি যথাযথ সম্মান থাকে না, তাই তাঁর প্রতি পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বও কম থাকে। ফলে পরিবারের অন্য সদস্যরা খাবার শেষ করার পর নারীর জন্য পুষ্টিকর খাবার খুব অল্প পরিমাণে অবশিষ্ট থাকে বা রাখা হয়। এই বাস্তবতায় অন্তঃসত্ত্বা নারীর পুষ্টি সব সময়ই আপসের শিকার হয়েছে। এর ফলে অপুষ্টি শুধু মায়ের শরীরেই নয়, নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

শিশুর ইমিউনিটি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নও
মানব উন্নয়নের প্রথম ধাপ শুরু হয় মায়ের গর্ভে। নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত না করে তাঁকে যদি শুধু মানবশিশু জন্মদানের যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, তবে সেখান থেকে জন্ম নেবে দুর্বল ও অপুষ্ট শিশু। এ ধরনের শিশু সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না; বরং অপুষ্ট শিশু বড় হয়ে জাতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে এবং তাকে সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত কর্মসূচি।
এটি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এই সমন্বিত কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে হবে স্বাস্থ্য, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ মন্ত্রণালয়। যথাযথ বাজেট, বিনিয়োগ ও সঠিক পরিকল্পনাই পারে নারীর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে, লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে এনে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সুযোগ দিতে। সেই সুযোগই একমাত্র পথ একটি সুস্থ শিশুর জন্ম ও তার সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য।

শুধু টিকা নয়, প্রয়োজন জেন্ডারভিত্তিক জনস্বাস্থ্য নীতি
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু হাম প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু টিকা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অপুষ্ট শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে পারে না। তাই মাতৃপুষ্টি, কিশোরী স্বাস্থ্য, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাকে একই জনস্বাস্থ্য কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।
প্রথমত, কিশোরী মেয়েদের জন্য স্কুলভিত্তিক পুষ্টি কর্মসূচি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধকে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, নিম্নআয়ের কর্মজীবী মায়েদের জন্য সরকারি নীতি অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন সহায়তা ও স্তন্যদানবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। 

অন্তঃসত্ত্বাকালীন ও শিশু জন্মদানের পর দরিদ্র পরিবারের মায়েদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্র বাড়িয়ে তাঁর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের কাজ পুরুষ সদস্যসহ অন্যদের মাঝে বণ্টন করতে হবে; যেন নারী নিজের ও শিশুর যত্ন নিতে পারেন। পিতৃত্ব ছুটি নিশ্চিত করতে হবে; যেন সন্তানের পুষ্টি গ্রহণের ক্ষেত্রে বাবা হিসাবে ভূমিকা পালন করতে পারেন।  
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু নয়; জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।

শেষ কথা
বাংলাদেশে হামের বিস্তার একটি গভীর সামাজিক বার্তা বহন করছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, অপুষ্টি শুধু খাবারের সংকট নয়; এটি জেন্ডার বৈষম্য, বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য এবং সহিংসতার সামষ্টিক ফল। যে সমাজে একজন নারী নিজের পুষ্টি, মাতৃত্ব বা স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, সেই সমাজে শিশুদের দুর্বল ইমিউনিটি অবশ্যম্ভাবী। তাই শিশুস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে শুধু শিশুর দিকে তাকালে চলবে না; মায়ের শরীর, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সে কারণেই মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে ‘নারীর ব্যক্তিগত দায়িত্ব’ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় জনস্বাস্থ্য ও জেন্ডার ন্যায্যতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে।

ফারহানা হাফিজ ও সাবিনা পারভীন: উভয়ই জেন্ডার বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×