ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

হরমুজ প্রণালি নিয়ে মার্কিন-ইরান বিরোধের নেপথ্য কথা

হরমুজ প্রণালি নিয়ে মার্কিন-ইরান বিরোধের নেপথ্য কথা
×

এম. কে ভদ্রকুমার

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশল হিসেবে সমুদ্রপথ ও সংকীর্ণ জলপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এটি মূলত ১৯৪২ সালে ডাচ-আমেরিকান ভূগোল-রাজনীতিবিশারদ নিকোলাস স্পাইকম্যানের প্রচারিত রিমল্যান্ড তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা ছিল ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ ভূগোল-রাজনীতি বিশারদ হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার হার্টল্যান্ড তত্ত্বের জবাব। ম্যাকিন্ডারের তত্ত্ব অনুযায়ী, ইউরেশীয় কেন্দ্রভাগ তথা রাশিয়া, যাকে তিনি ‘পিভট এলাকা’ বা ‘হার্টল্যান্ড’ নাম দিয়েছিলেন, তা নৌশক্তির নাগালের বাইরে হলেও একটি বৃহৎ বিশ্বশক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার বিপুল ক্ষমতা রাখে এবং সারাবিশ্বকে শাসন করতে সক্ষম হবে।

ম্যাকিন্ডার বিশ্বকে বিভক্ত করে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাকে ‘ওয়ার্ল্ড আইল্যান্ড’ বা ‘বিশ্ব দ্বীপ’ নাম দিয়েছিলেন; যা বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ স্থলভাগ এবং বিশ্বের সাত-অষ্টমাংশ জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত। কিন্তু সেটি ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক ‘পেরিয়ে’ আসার আগের কথা, যার পর তারা ধীরে ধীরে একটি আন্তঃআটলান্টিক শক্তি এবং বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়। এমনকি কিছু সময়ের জন্য বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি বা ‘হাইপারপাওয়ার’ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ম্যাকিন্ডারের হার্টল্যান্ড তত্ত্ব মার্কিন কৌশলবিদদের তাড়া করে ফিরছিল। জবিগনিউ ব্রেজিনস্কির ক্ল্যাসিক কাজ ‘দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড’ (১৯৯৭) সরাসরি ম্যাকিন্ডারের হার্টল্যান্ড তত্ত্ব গ্রহণ করে, এর চিরায়ত ইউরেশীয় কেন্দ্রবিন্দুকে একটি এক মেরু, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের প্রেক্ষাপটে নতুন করে তুলে ধরে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র বিশ্বপরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। অবশ্যই এটি ছিল চীন ম্যাকিন্ডার ও ব্রেজিনস্কি উভয়কেই উল্টে দেওয়ার আগের ঘটনা।

ব্রেজিনস্কির মতে, বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বজায় রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই কোনো একক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উত্থান ঠেকাতে ইউরেশীয় ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে। ম্যাকিন্ডার হার্টল্যান্ডে প্রবেশ করতে সক্ষম এমন একটি স্থল-সমুদ্রশক্তি জোটের উত্থান ঠেকাতে চেয়েছিলেন, যা ব্রেজিনস্কিকে আকৃষ্ট করেছিল। এর মাধ্যমে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর জোট গঠন প্রতিরোধ করা যেত। ব্রেজিনস্কি ম্যাকিন্ডারের ভৌগোলিক মডেলটিকে একটি নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতির রূপ দেন, মার্কিন কৌশলবিদরা এখনও যা ব্যবহার করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো মার্কিন কর্মকর্তারা নিছক কূটতর্কে লিপ্ত হচ্ছেন, যখন তারা বলেন যে হরমুজ প্রণালিতে যা ঘটছে, তা ‘নতুন নজির সৃষ্টিকারী’।

প্রকৃতপক্ষে জলপথ সুরক্ষিত করার সংগ্রাম পাহাড়ের মতোই প্রাচীন। গত সপ্তাহান্তে প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি আকর্ষণীয় নিবন্ধের শিরোনাম ছিল–‘বিশ্বের সংকীর্ণ সমুদ্রগুলোতে ক্ষমতার লড়াই’। এতে বলা হয়, এ ধরনের সংকীর্ণ জলপথগুলো বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের জন্য একটি প্রধান দুর্বলতা। যেমন–নাবিকেরা যখন এই আঁটসাঁট জলপথে চলাচল করেন, তখন তারা জলদস্যু থেকে শুরু করে জঙ্গি এবং নিয়ন্ত্রণকামী প্রধান শক্তিগুলোর ঝুঁকির সম্মুখীন হন। এখন হরমুজ প্রণালিতে সেই দুর্বলতাগুলো উন্মোচিত হচ্ছে। 

প্রসঙ্গত, ট্রাম্প পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি পশ্চিম গোলার্ধের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য চীনকে এই জলপথ ব্যবহারে বাধা দিয়েছেন। তবে জানা গেছে, পানামা খালের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর করতে বেইজিং ‘নিকারাগুয়া খাল নির্মাণের কাজ পুনরায় শুরু করা’র পরিকল্পনা করছে।

মালাক্কা প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তিটি দক্ষিণ চীন সাগরে ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতা’কে সরাসরি প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কথিত মার্কিন পরিকল্পনাটিও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার পরেই ইরান হরমুজ প্রণালিকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করতে বাধ্য হয়েছিল।

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ইন্ডিয়ান পাঞ্চলাইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম।
 

আরও পড়ুন

×