অন্যদৃষ্টি
‘কিচেন কেবিনেট’-এর গল্প
তাপস দাস
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি রাষ্ট্র যখন সংকটের ভেতর দিয়ে যায়, তখন জনগণ অন্তত একটি জিনিস আশা করে–সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা থাকবে, দায়বদ্ধতা থাকবে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সাবেক উপদেষ্টাদের একের পর এক বক্তব্য শুনলে মনে হয়, যেন রাষ্ট্র পরিচালনা নয়; চলছিল দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা।
একজন বলছেন, ‘আমি কিচেন কেবিনেটে ছিলাম না’, আরেকজন বলছেন, ‘চুক্তির বিষয়ে আমাকে জানানো হয়নি।’ কেউ বলছেন, ‘শেষ দিন পর্যন্ত বিরোধিতা করেছি।’ আবার কেউ জানাচ্ছেন, ‘সব সিদ্ধান্ত হতো একটি গোপন বৈঠকে।’ এই বক্তব্যগুলো কেবল ব্যক্তিগত আত্মপক্ষ সমর্থন নয়; বরং এগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাষ্ট্র পরিচালনার এক ভয়ংকর চিত্র। এমন একটি কাঠামোর ছবি, যেখানে জনগণের কাছে জবাবদিহির চেয়ে ক্ষমতার অন্দরমহলের গোপন সমঝোতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটি সাধারণত এমন এক অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রকে বোঝায়, যেখানে সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে বসে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ মন্ত্রিসভা আছে, দপ্তর আছে, উপদেষ্টা পরিষদ আছে–আসল সিদ্ধান্ত হয় একটি ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে।
যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে যে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, পররাষ্ট্রনীতি বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কয়েকজনের গোপন বৈঠকে নির্ধারিত হয়েছে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, আজ যারা বলছেন–‘আমরা জানতাম না’, ‘আমাদের ডাকা হয়নি’, ‘আমরা অবহিত ছিলাম না’–তারা প্রত্যেকেই তখন রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
বর্তমানে অনেকেই এমন একটি বয়ান দাঁড় করাতে চাইছেন যেন সব সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তি একাই নিয়েছেন, আর বাকিরা ছিলেন অসহায় দর্শক। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো একক ব্যক্তির নাটক নয়। একটি উপদেষ্টা পরিষদ, প্রশাসনিক কাঠামো ও নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থার ভেতরে যারা ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় আছে।
কেউ যদি সত্যিই মনে করে থাকেন কোনো চুক্তি দেশবিরোধী, তাহলে প্রশ্ন আসে–তারা কি প্রকাশ্যে আপত্তি তুলেছিলেন? তারা কি পদত্যাগ করেছিলেন? তারা কি জনগণকে সতর্ক করেছিলেন? ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নীরব থেকে পরে এসে ‘আমি জানতাম না’ বলা আসলে দায়মুক্তির সহজ কৌশল।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মেরূকরণ এমন এক পর্যায়ে গেছে, যেখানে শিশু-কিশোরদেরও বিভিন্ন অপকর্ম, উস্কানি ও উগ্র আচরণে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এটি কোনো সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। যে রাষ্ট্রে তরুণদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক বিকাশের পথে নেওয়ার কথা, সেখানে যদি তাদের ঘৃণা, সহিংসতা বা উচ্ছৃঙ্খলতার হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে সেই দায় শুধু মাঠের কর্মীদের নয়; নীতিনির্ধারকদেরও।
ক্ষমতার রাজনীতি যখন নৈতিকতা হারায়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
জনগণ এখন ব্যাখ্যা নয়, সত্য জানতে চায়। আজ মানুষ দেখতে পাচ্ছে–ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যারা একে অপরের প্রশংসা করেছেন, তারা এখন একে অপরের দিকে দায় ঠেলে দিচ্ছেন। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন খুব সরল: কোন কোন চুক্তি হয়েছে? কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন পাশ কাটানো হয়েছে? জনগণের স্বার্থ কতটা রক্ষা করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক নাটক দিয়ে চাপা দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখন বিরোধী দলের অভাব নয়; বরং দায় স্বীকার করার সংস্কৃতির অভাব। ক্ষমতায় থাকলে সবাই সিদ্ধান্তের মালিক, আর ক্ষমতা চলে গেলে সবাই নির্দোষ–এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রকল্প নয়। এটি জনগণের আমানত। সেই আমানতের সঙ্গে গোপনীয়তা, অস্বচ্ছতা ও দায় এড়ানোর রাজনীতি যত বাড়বে, জনগণের আস্থার সংকটও তত গভীর হবে।
তাপস দাস: যুব সংগঠক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
