বাড়ছে এইচআইভি রোগী
কুমিল্লায় ৫ মাসে এইডসে ৭ মৃত্যু
গত মে মাসে মারা গেছেন ৩ পুরুষ
কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:১৫ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি থাকলেও শুধু সচেতনতার অভাবেই এইডস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বাড়ছে সীমান্তের জেলা কুমিল্লায়। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এইডসে আক্রান্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের গত পাঁচ মাসে মারা গেছেন সাতজন। এর মধ্যে মে মাসেই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের এইচআইভি-এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিন আরিফ হাসান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।
হাসপাতালের এইডস ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুসারে, বর্তমানে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩৮৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজন সমকামীও আছেন। কুমিল্লায় চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৬৭২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩৭ জন এইডস পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ যৌনকর্মী। ১৮ জন পুরুষ-পুরুষ যৌন সম্পর্ক থেকে, তিনজন বিবাহিত সম্পর্ক থেকে এবং দুজন বিদেশে থাকা অবস্থায় আক্রান্ত হয়েছেন।
কুমেক হাসপাতালে ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ছয় হাজার ৬৪৬টি পরীক্ষায় ২৭৩ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ২২৬টি পরীক্ষায় ১৫ জন, ২০২০ সালে ৩১১টি পরীক্ষায় ৮ জন, ২০২১ সালে ৪৯৮টি পরীক্ষায় ১৪ জন, ২০২২ সালে ৭৮৬টি পরীক্ষায় ২১ জন, ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৩০টি পরীক্ষায় ৪৮ জন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৮১টি পরীক্ষায় ৫৮ জন, ২০২৫ সালে ১ হাজার ৪৪২টি পরীক্ষায় ৭২ জন। পরিসংখ্যান বলছে, এই সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী।
এদিকে, গত ২৫ মে এইডসে মারা গেছেন ২১ বছর বয়সী বিবাহিত এক যুবক। ১৩ মে মৃত্যুবরণ করেন ৪৯ বছর বয়সী পুরুষ এবং ৮ মে মৃত্যুবরণ করেন ৩৫ বছর বয়সী অপর এক পুরুষ। তারা তিনজনেই কুমিল্লার বাসিন্দা। ২১ বছরের যুবক ২০২১ সালে এইচআইভি আক্রান্ত নিশ্চিত হলেও, অপর দুইজনের বেলায় শেষ মুহূর্তে এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ে। এ নিয়ে ২০২৬ সালে কুমিল্লায় মোট সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত জানুয়ারি মাসে দুইজন, মার্চ মাসে একজন, এপ্রিল মাসে একজন ও মে মাসে তিনজন মারা গেছেন।
মারা যাওয়া এক যুবকের স্ত্রী জানান, তাদের একটি শিশুসন্তান আছে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী এইচআইভি পজিটিভ হলেও সে তা জানায়নি। স্বামীর মৃত্যুর পর কুমিল্লা মেডিকেলে পরীক্ষা করে জানতে পারি আমিও এইচআইভি পজিটিভ। শ্বশুরবাড়ি থেকে আমাকে এই চিকিৎসা নিতে বাধা দিচ্ছে। তারপরও আমি চিকিৎসা নিতে এসেছি।’
কুমেক হাসপাতালের কর্মকর্তা মো. আরিফ হাসান বলেন, ‘আগে বেশির ভাগ সংক্রমণই রক্ত আদান-প্রদানের মাধ্যমে ছড়াত। এখন যেসব কেস পাওয়া যাচ্ছে, যৌনবাহিত বলেই শনাক্ত হচ্ছে।’
২০১৯ সাল থেকে তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত শনাক্ত এইডস রোগীদের মধ্যে পুরুষ-পুরুষ যৌন সম্পর্ক থেকে ৯১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া, যৌনকর্মী থেকে ৪০ জন এবং প্রবাস থেকে ফেরত আসা ৪৯ জন এইডস আক্রান্ত হয়েছেন। এইচআইভি সংক্রমিত বিবাহিত সঙ্গী থেকে সংক্রমিত হয়েছেন ৪১ জন। আর নারী যৌনকর্মী থেকে ছড়িয়েছে ২১ জনে।
বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসা
আরিফ হাসান বলেন, যারাই আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের সরকারিভাবে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধ সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত চিকিৎসা নিলে তারা সুস্থও হন। সংক্রমণমুক্ত হন। এইডসের প্রধান ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি হলো অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি)। এটি ভাইরাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারে না, তবে এর বংশবৃদ্ধি ঠেকায়। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখে। নিয়মিত এআরটি নিলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন রেজা মো. সারোয়ার আকবর বলেন, সরকারি-বেসরকারিভাবে এইডস নির্ণয় ও আক্রান্তদের জন্য দেশে পর্যাপ্ত ও আধুনিক চিকিৎসা থাকলেও আক্রান্তদের অনেকেই বিষয়টি গোপন রাখেন। এতে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।
- বিষয় :
- মৃত্যু
