ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

নাগেশ্বরীতে ঘর হারানোর আতঙ্কে দিন কাটে শত পরিবারের

এক মাসে নদীতে বিলীন তিন শতাধিক ঘর

নাগেশ্বরীতে ঘর হারানোর আতঙ্কে দিন কাটে শত পরিবারের
×

ছবি: সমকাল

লিটন চৌধুরী, নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ২০:২২

উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির পর পানি কমতে শুরু করলেও কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে ভয়াবহ আকার নিয়েছে নদীভাঙন। গত এক মাসে দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গাধর নদীর ভাঙনে অন্তত তিন শতাধিক বসতঘর, ফসলি জমি, বাগান, গ্রামীণ সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। ঘর হারানো অনেক পরিবার বাঁধ কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং স্থায়ী প্রকল্প না থাকায় প্রতিবছর একই দুর্ভোগের মুখে পড়ছেন তারা।

সরেজমিন দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বামনডাঙ্গা, রায়গঞ্জ, নারায়ণপুর, নুনখাওয়া ও বল্লভেরখাস ইউনিয়ন। কোথাও পুরোনো জনপথ হারিয়ে গেছে, কোথাও বসতভিটা ও কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার রাত জেগে ভাঙনের আতঙ্কে কাটাচ্ছে।

বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের কুটিরচর এলাকায় গত এক মাসে অন্তত ৬০টি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন ইউপি সদস্য বাবুল মিয়াসহ স্থানীয় বহু পরিবার। ভিটেমাটি হারানোর শোক সইতে না পেরে গাজী মিয়া নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।

ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া বলেন, মাত্র এক হাজার জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। স্বাভাবিকভাবেই এ উদ্যোগ ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর হয়নি। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে পুরো ওয়ার্ড নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চর লুছনির বাসিন্দা শাহ আলম মিয়া বলেন, একাধিকবার ঘর হারিয়ে এখন তিনি প্রায় নিঃস্ব। ওই এলাকায় সড়ক, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অসংখ্য স্থাপনা এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রায়গঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য রিয়াজুল ইসলাম জানান, গত ১৫ দিনে চর দামালগ্রাম ও বীর দামালগ্রাম এলাকায় প্রায় ৭০টি ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচমাথা ঘাট সড়কও ভেঙে গেছে। কয়েক দিন ধরে জিওব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙন থামছে না।

হাজিরমোড় এলাকার আতাউর রহমান আপেল বলেন, ‘প্রতিটি দিন কাটছে ঘর হারানোর আতঙ্কে।’ মজিরন বেগম বলেন, ‘স্বামী নেই। একমাত্র বসতভিটাটুকুও নদী গিলে ফেললে কোথায় যাব জানি না।’

নুনখাওয়া ইউনিয়নের ফকিরগঞ্জ এলাকায় ৪০টি এবং ব্যাপারীরচরে আরও প্রায় ২০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। বল্লভেরখাস ইউনিয়নের মাঝিপাড়ায়ও গঙ্গাধরের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নারায়ণপুর ইউনিয়নে। চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত এক মাসে ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গাধরের ভাঙনে অন্তত দেড় শতাধিক ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। বালারহাট বাজার মসজিদও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে। তিনি বলেন, প্রতিবছর আবেদন করলেও স্থায়ী প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জিওব্যাগ ফেললেও অধিকাংশ স্থানে তা ভাঙন ঠেকাতে পারছে না।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ঢেউটিন, গৃহনির্মাণ অনুদান ও শুকনো খাবারের বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই বিতরণ করা হবে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জেলার ৩৮টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে জিওব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। বামনডাঙ্গা ও রায়গঞ্জেও কাজ চলমান রয়েছে। স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প কবে শুরু হবে, উপজেলার কোন কোন এলাকা অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে একাধিকবার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদেও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ এবং স্থায়ী ভাঙনরোধ প্রকল্পের দাবিও জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

×