উচ্চশিক্ষা
পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্কের উদ্দেশ্য কী?
মাহবুবুর রাজ্জাক
মাহবুবুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:০৮ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ১১:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে এক অসার বাগ্যুদ্ধ চলছে। অথচ বাস্তবতা হলো, কয়েকটি সূচক ছাড়া অধিকাংশ সূচকেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খাবি খাচ্ছে। নিজের দোষ-গুণ যাই থাক, আমরা অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করতে চেষ্টার ত্রুটি করি না। কবিগুরুর ভাষায়, ‘‘কেরোসিন-শিখা বলে মাটির প্রদীপে, ভাই বলে ডা’কো যদি দেবো গলা টিপে...।’’ অথচ এখন আলো ঝলমল বৈদ্যুতিক বাতির যুগ। অহেতুক তর্ক করে লাভ নেই।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নয়, সার্বিকভাবে আমাদের শিক্ষার মান নিয়েই প্রশ্ন আছে। বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীরা যে দক্ষতা অর্জন করে, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সপ্তম শ্রেণি শেষে অর্জিত দক্ষতামানের সমান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করলে এই কথার প্রমাণ মেলে। স্পষ্টত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তির জন্য কাঙ্ক্ষিত মানের ছাত্র পায় না। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিখন ঘাটতি দূর না করেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ে বিতর্ক করা তাই অনুচিত।
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এই সময়েই ছাত্রদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কে উচ্চশিক্ষায় যাবে আর কে শ্রমবাজারের জন্য নিজেকে তৈরি করবে। এ পথ নির্বাচনে ভুল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনায় মনোযোগ হারাতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র ভর্তি করা হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ছাত্ররা পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পায় না। তাদের অনেকেই পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে অমনোযোগী ছাত্রে পরিণত হয় এবং ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই বেশির ভাগ ছাত্রই যাতে পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়তে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য হলো, সে কোর্স ডিজাইন ও পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সময় শ্রমবাজারের চাহিদার বিষয়টি মাথায় রাখবে। সাবেক ছাত্র তথা অ্যালামনাইদের পরামর্শ নেবে, চাকরিদাতাদের পরামর্শ নেবে। আমাদের দেশে এই সংস্কৃতি এখনও ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি।
একাডেমিয়ার বৃহৎ অংশই মনে করে দলীয় রাজনীতি একাডেমিক পরিবেশকে কলুষিত করে থাকে। তাই যারা একাডেমিক কার্যক্রমে মনোযোগী হতে চান, তারা রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন। অন্যদিকে রাজনীতিতে জড়িত শিক্ষকরা সাধারণত একাডেমিক কাজে পিছিয়ে থাকেন। সরকার এটি ভালো করেই জানে। তারপরেও তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এটি আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি দুর্ভাগ্য। ক্ষতি হবে জেনেও সরকার তার দলীয় শিক্ষকদের হাতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়। এরপরেও সরকারের দায়িত্বশীল কেউ যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো চলছে না বলে আফসোস করেন, তখন অবাক হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
আমাদের দেশের জনমানসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান স্পষ্ট নয়। অনেকে এটিকে জ্ঞান তৈরির নয়, সার্টিফিকেট অর্জনের স্থান মনে করে থাকেন। আজকাল জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, ক্যাম্পাস হয়েছে, অবকাঠামো হয়েছে। রাজনীতিকরা একে বলেন উন্নয়ন। অথচ শিক্ষক নেই, গবেষণাগার নেই, লাইব্রেরি নেই। তবে পলিটিকস আছে। মারামারি আছে। এই সুযোগে শিক্ষক হিসেবে চাকরি বাগিয়ে নিচ্ছেন ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়স্বজন ও দলীয় লোকজন। অবস্থা যখন এই, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে চিন্তা করা সময়ের অপচয় বৈ কিছু নয়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত আন্ডারগ্রেড (স্নাতক) বিশ্ববিদ্যালয়। কোথাও উল্লেখ করার মতো শক্তিশালী স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম নেই। কারণ শিক্ষকতা আর কৃষি গবেষণা ছাড়া অন্যত্র চাকরিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির তেমন চাহিদা নেই। এই দেশে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি একটি ফ্যাশন মাত্র। অনেক ক্ষেত্রেই সত্যিকারের গবেষণা করে অর্জিত ডিগ্রি নয়। টাকা ছাড়া গবেষণা হয় না। সরকার যে ফান্ড দেয়, তার সিংহভাগ মূলত অবকাঠামো তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদিতেই খরচ হয়ে যায়। গবেষণা হবে কী দিয়ে! বুয়েটে একটি মাস্টার্স থিসিসের জন্য চার হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। এই টাকা কাগজ কেনা আর টাইপিংয়েই খরচ হয়ে যায়। পাবলিকেশন করতে টাকা লাগে। সেই টাকা পকেট থেকেই দিতে হয়।
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো মানের স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম না থাকলে তার র্যাঙ্কিং, গবেষণা, সাইটেশন ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তার কোনো মানে হয় না। আমরা পাবলিকেশন সংখ্যা আর সাইটেশন দিয়েই গবেষণার ভার পরিমাপ করি। ভালো স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম না থাকলে জোড়াতালি দিয়ে পাবলিকেশন হতে পারে বটে, তবে গবেষণার সংস্কৃতি তৈরি হয় না। সেই পাবলিকেশন দেশের উপকারেও আসে না।
আমরা যদি চাই আমাদের একটি অথবা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের হবে, তবে পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করতে হবে। সেখানে প্রয়োজনে বৃত্তি দিয়ে হলেও বিদেশ থেকে ছাত্র আনতে হবে। দেশি-বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বিশ্বমানের একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশি শিক্ষকদের প্রাসঙ্গিক বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাদা করে গবেষণা খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। যারা গবেষণায় দক্ষতা অর্জন করবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে তাদের জন্য চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। সরকারে যারা থাকেন তাদের দায়িত্ব ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির উদ্যোগ নেওয়া, প্রাইভেট-পাবলিক বিতর্ক উস্কে দিয়ে মজা লোটা বা নন-ইস্যু দিয়ে জরুরি ইস্যুকে চাপা দেওয়া নয়।
ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুবুর রাজ্জাক
- বিশ্ববিদ্যালয়
