ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রবন্ধ

অগ্নি-বীণা: একশ বছর পর

অগ্নি-বীণা: একশ বছর পর
×

কাজী নজরুল ইসলাম [২৪ মে ১৮৯৯-২৯ আগস্ট ১৯৭৬]

সুমন সাজ্জাদ

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভালো লাগেনি নজরুলের কবিতা। নজরুল সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নেতিবাচক। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলনে নজরুল ছিলেন অনুপস্থিত। যদিও তাঁর শিল্পগুরু বুদ্ধদেব বসু নজরুলকে স্থানচ্যুত করেননি আধুনিক কবিতার বই থেকে। অবশ্য বুদ্ধদেব বসুও সপ্রতিভ মন্তব্যে প্রায় খারিজ করে দিয়েছিলেন নজরুলের কবিতাকে; কিন্তু নজরুলের গানের মালার দান অস্বীকার করেননি তিনি। খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিক-সমালোচক অনেকেই নজরুলের সাহিত্য বিষয়ে ছিলেন নীরব ও নিস্পৃহ; অথচ নজরুলকে নিয়ে বঙ্গদেশে ছিল উচ্ছ্বাসের অগণিত ঢেউ। কেমন ছিল সেই ঢেউ? আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে তার হিসাব নিতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্যে; ভেসে যেতে হবে শত বছরের সময়-সমুদ্রে।
একশ বছর আগে ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে বেরিয়েছিল একটি বই- 'অগ্নি-বীণা'। বঙ্গাব্দের হিসাবে সন ছিল ১৩২৯। কবি নিজেই ছিলেন প্রকাশক। কোনো কোনো সূত্রে প্রকাশক হিসেবে আর্য পাবলিশিংয়ের শরচ্চন্দ্র গুহের নামও পাওয়া যায়। বইটির দাম এক টাকা। ১৩৩০ থেকে ১৩৩৩ কালপর্বের মধ্যে বেরিয়েছিল 'অগ্নি-বীণা'র চারটি সংস্করণ। চতুর্থ সংস্করণের মুদ্রণ সংখ্যা ছিল ২২০০। 'অগ্নি-বীণা'র দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল নজরুলের। তথ্যগুলো সামনে রাখছি ইচ্ছে করেই; আমাদের স্মৃতিভ্রষ্ট মনকে জানান দিতে চাই- কবিতার বইও বাজারে চলত; কবিতাও গরম করে তুলত চায়ের দোকান, সাহিত্যের আড্ডাখানা আর রাজনীতির ময়দান। কবিতাও ছিল সময়ের দুর্দান্ত কুশীলব। আজ এই কালে আমাদের কারও কারও পক্ষে হয়তো কল্পনা করাও অসম্ভব- অগ্নি-বীণার প্রচণ্ড ঝংকারে নড়ে উঠেছিল সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক ভূগোল। কেঁপে উঠেছিল বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর; যাঁর আট কুঠুরি আর নয় দরোজা জুড়ে প্রায় একক আধিপত্যে বিরাজ করছিলেন 'রবীন্দ্র ঠাকুর'। মোদ্দা কথা, রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন এক মহাবয়ান। আর নজরুল বাঙালির জন্য তৈরি করছিলেন ভিন্ন এক বয়ান।
ততদিনে নজরুল অবশ্য চেনা মানুষ। দৈনিক নবযুগের পাতায় যে সম্পাদকীয়গুলো লিখেছিলেন সেগুলোর দৌলতে বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে পত্রিকাটি। ১৯২২ সালে 'ধূমকেতু' পত্রিকায় বলে ফেলেছেন, 'ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না।' ১৩২৮ সালের কার্তিক, পৌষ আর মাঘ মাসের হিম হিম ঠান্ডায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মোস্‌লেম ভারত, বিজলী ও প্রবাসীর পাতা; আগুনের হলকার মতো ত্বরিত তৎপরতায় ছড়িয়ে পড়েছিল 'বিদ্রোহী'। একই কবিতা পরপর মুদ্রিত হয়েছে তিনটি পত্রিকায়। কবি ও কবিতার এই খ্যাতি অগ্নি-বীণাকে দিয়েছিল বাড়তি প্রণোদনা। কী ছিল সেই বইটিতে? কেন এই বই স্থান পেয়ে গেল বাংলা কবিতার শাশ্বত আসনে? কেনই উন্মুখ পাঠক সরব উত্তেজনায় পড়েছিল বইটিকে?
অগ্নি-বীণায় ছিল ১২টি কবিতা; হ্যাঁ, মাত্র ১২টি কবিতাই। একটি যুগের অবসান এবং আরেকটি যুগের আরম্ভক্ষণ ঘোষণা করার জন্য এক ডজন কবিতাই যথেষ্ট ছিল। এই বইয়ের কবিতা ও কবিকে লুফে নিয়েছিল সবাই। কিন্তু কী বলতে চেয়েছিল এই বই? যদি বলি প্রলয়ের উল্লাস, তবে তা-ই; যদি বলি সৃজনের আনন্দ-ব্যথা, তবে তা-ই। যেমন করে কেউ বলেনি, ঠিক তেমন করেই বললেন তিনি; আঁকড়ে ধরলেন ধ্বংস ও সৃষ্টির দুই প্রতিমাকে। তাঁর কবিতা পড়ে মনে হচ্ছিল, ভয়ংকর একটা কিছু ধেয়ে আসছে; আকাশ-পাতালব্যাপী এক প্রলয় ভেঙে চুরমার করে দেবে সবকিছু, 'বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর।' তরুণ নজরুল প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন 'ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? - প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!'; আবার বলেছেন, 'ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর!'
অগ্নি-বীণায় নজরুল মূলত ভেঙেই গড়েছিলেন কবিতার নতুন সৌধ; কবিতায় খুঁজে ফিরেছিলেন নতুন এক 'আমি'কে। বাঙালি মধ্যবিত্তের চিত্তসত্তায় ঘুমন্ত আমিকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন। তার ধ্রুপদি প্রমাণ 'বিদ্রোহী' কবিতা- বাঙালির মননপৃষ্ঠায় যার আছে চিরায়ত স্থান। এখন আর প্রশ্ন জাগে না, কার বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহ? কে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী? নজরুলের জীবন ও সাহিত্যের অবারিত খ্যাতি সেসব প্রশ্নের জবাব অনেক বর্ষ আগেই দিয়ে গেছে। এ কারণে সময়, সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা শাসনকাঠামো ইত্যাদি অনেক শব্দ দিয়েই হয়তো দ্যোতিত করতে পারি কবির বিপরীত বাস্তবতাকে। তিনি নিজেও কি নিজেকে ভাঙতে চাননি? 'আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস'- এই যদি হয় তাঁর মর্মভাষা তাহলে বলতেই হবে কবির লড়াই ছিল নিজের বিরুদ্ধেও। কারণ, একটি ছাপোষা মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্ব বহন করতে করতে অন্য অনেকের মতো তিনিও ক্লান্ত। তাঁর মনের কোণেও লুকিয়ে আছে খানিকটা আশাবাদ, খানিকটা বিপ্লব। কিন্তু কোন পথে বদলাবে দেশ সমাজ রাষ্ট্র?
নজরুল ফিরে তাকিয়েছেন ধ্বংসের দিকে; বিনষ্টির পর, হয়তো সমুখেই 'শান্তি পারাবার'- নতুনের আহ্বান। তত দিনে ঘটে গেছে রুশ বিপ্লব। সেই ধ্বনিও তিনি শুনতে পেয়েছিলেন। ওদিকে বদলাচ্ছে তুরস্কের ইতিহাস। আর বঙ্গদেশে চলমান তখন ধর্ম, জাতীয়তা, দাঙ্গা ও আত্মপরিচয়ের সংকট। বদলে যাচ্ছিল দেশকালের অন্তঃসলিলা প্রবাহ। হয়তো সেই প্রবাহেই রূপান্তরের আগমনী গান তিনি শুনতে পেয়েছেন। নজরুল শোনালেন, ''বিশ্বকণ্ঠে/ বন্দনা-বাণী লুণ্ঠে- 'বন্দে মাতরম্‌!!!'' বাংলা অঞ্চলের রাজনৈতিক পটভূমে মাতৃবন্দনার পেক্ষাপট প্রস্তুত হয়েই ছিল। নজরুল সেটিকে ব্যবহার করলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কার্যকারণ ও পদ্ধতিতে। 'আগমনী' কবিতায় তা এলো কেবল একটি শব্দের ভেতর দিয়ে 'বন্দে মাতরম্‌'।
অবাক হতে হয় এই ভেবে যে, প্রায় বাজি ধরে নেহাত দুর্গা ও অসুরের লড়াইকে ভাববস্তু করে রচিত হয়েছিল অগ্নি-বীণার বিখ্যাত 'আগমনী'। 'উপাসনা' পত্রিকার সম্পাদক সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, 'লেখ দেখি দেব-অসুরের যুদ্ধ নিয়ে একটা কবিতা- যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া চাই। পুজো তো এসে গেল- ছাপিয়ে দিই কবিতাটা।' যুদ্ধের আবহ, অসুর-দুর্গার লড়াইয়ের পাশাপাশি আমাদের মনে পড়বে বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী তত্ত্বগুরু শ্রী অরবিন্দ বঙ্কিমচন্দ্রের এই গানটিকেই বলেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
প্রকৃতপক্ষে স্বদেশী আন্দোলনের কালে দেশমাতার ধারণা প্রবল প্রতাপ নিয়ে হাজির হয়েছিল। অগ্নি-বীণায় নজরুল তাড়িত হয়েছেন এই মাতৃপ্রতীকে। 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় সেই প্রতীকের নাম 'বিশ্ব-মায়ের আসন'; 'বিদ্রোহী' কবিতায় পাচ্ছি, 'বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল'; পরের কবিতায় পাচ্ছি, 'রক্তাম্ব্বরধারিণী মা'। আর এ ধরনের প্রতীকতার সূত্রে নজরুলের কবিতার সঙ্গে তৈরি হয়ে গেছে রাজনীতি ও নন্দনতত্ত্বের যোগসূত্র। দেখা যাবে, অগ্নি-বীণার কবিতাগুলোর কবিতা হয়ে ওঠার পেছনে জড়িয়ে আছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সমাজ-রাজনৈতিক ঘটনা ও অনুষঙ্গ।
আবার কখনও কখনও কোনো ছোট একটি অনুষঙ্গকে নজরুল নিয়ে গিয়েছেন বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে। 'খেয়াপারের তরণী' কবিতার উৎসেও ছিল একটি ছবি; শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জের মুখে ছবির ভাবকে রূপ দিয়েছিলেন কবিতায়। ছবিটি ছিল খেয়া নৌকায় যাত্রী পারাপারের; নজরুল ছবিটিকে ভেঙে গড়লেন চিত্তশুদ্ধির কবিতা। 'শাত-ইল-আরব' কবিতার ক্ষেত্রে এ রকম ঘটেছে। যার উৎসে ছিল মেসোপটেমিয়া অঞ্চলবিষয়ক বইয়ে মুদ্রিত একটি ছবি। 'মোস্‌লেম ভারত' পত্রিকার সম্পাদক আফজালুল হক ছবিটি ছাপতে আগ্রহী হন। পরিচিতি হিসেবে নজরুল লিখে দিলেন 'শাত-ইল-আরব'। দজলা ও ফোরাত যেখানে মিলিত হয়েছে তারই নাম 'শাত-ইল-আরব'। এই নদীপ্রবাহের তীরজুড়ে যুদ্ধরতদের ইতিহাসের সঙ্গে নজরুল গেঁথে দিয়েছেন বাংলার ভাগ্য, 'ইরাক-বাহিনী! এ যে গো কাহিনী,-/ কে জানিত কবে বঙ্গ-বাহিনী/ তোমারও দুঃখে 'জননী আমার!' বলিয়া ফেলিবে তপ্ত নীর!'
নিশ্চয়ই আমাদের মনে পড়বে, নজরুল অগ্নি-বীণা বইটি উৎসর্গ করেছেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে, যিনি বিপ্লবী, চরমপন্থি ও সন্ত্রাসবাদী দলের সদস্য ছিলেন। আন্দামানে দ্বীপান্তরিত থাকা অবস্থায় বারীন্দ্রকুমার লিখেছিলেন বিখ্যাত বই 'দ্বীপান্তরের বাঁশি'। তাঁকে উদ্দেশ করে নজরুল লিখেছেন, 'ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর।' খেয়াল করি, তাঁকে নিবেদিত উৎসর্গ কবিতায় আছে 'অগ্নি-বীণা' শব্দটি। আর তাই সন্দেহ থাকে না যে, বিপ্লববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নজরুলকে আকৃষ্ট করেছিল। বলা ভালো, শাসকের জন্য যা সন্ত্রাস, শোষিতের জন্য তা মুক্তিসংগ্রাম। নজরুলের প্রতিরোধী অবস্থান বাঙালি পাঠককে প্রত্যাশিতভাবেই উদ্বেলিত করতে পেরেছিল।
আমরা সেই কালের গল্প বলছি, যে কালে হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে সাংস্কৃতিক ভেদের চেয়েও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল রাজনৈতিক ভেদ। বাঙালিত্বের সংজ্ঞায়ন তখনও অমীমাংসিত। মুসলমানরা বিশেষভাবে খুঁজেছে মুসলমানিত্ব, হিন্দুরা খুঁজেছে হিন্দুত্ব। ভারতীয় জাতীয় চেতনা কিংবা বাঙালির জাতীয় চেতন অখণ্ড ঐক্যে স্থিত হতে পারেনি। 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের প্রথম দুই-তিন পৃষ্ঠার ভেতর শরৎচন্দ্রের মতো প্রতিভা যখন লিখে ফেলেছেন, ''ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের 'ফুটবল ম্যাচ''। খেলাটা হয়তো বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলমানের মধ্যেই চলছিল। রাজনীতির খেলার মাঠে মুসলমান ছুটেছে মুসলমানিত্বের দিকে, হিন্দু ছুটেছে হিন্দুত্বের দিকে। রুদ্ধশ্বাস এই দৌড়ে শামিল হননি নজরুল। অন্য এক কণ্ঠস্বর নিয়ে হাজির হলেন তিনি। শিব আর ইসরাফিলের সাংস্কৃতিক মূল্য তাঁর কাছে বিষম নয়। তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে তুরস্কের আনোয়ার ও কামাল পাশা; মর্হ‌রম, কোরবানি কিংবা হোমাগ্নি ও যজ্ঞ তৈরি করেনি কোনো ভেদরেখা। হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্যবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের মর্মসার এসে মূর্ত হয়ে উঠেছে নজরুলের কবিতায়। বাঙালির সম্প্রদায় নিরপেক্ষ জাতীয় পরিচয়ের এক সাংস্কৃতিক প্রতীক অগ্নি-বীণা।
এক ঝটকায় নজরুল বদলে ফেললেন বাংলা কবিতার প্রথাগত রীতি। দ্রুতগামী অশ্বের মতো চটুল হলো তাঁর ছন্দ, সাঁড়াশি আক্রমণের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর শব্দের চকচকে তলোয়ার; অভিযানী মন নিয়ে দুর্গম পথে ছুটে ফিরল তাঁর কবিতা। শব্দের পরিগ্রহণে বিন্দুমাত্র আবদ্ধ হলেন না ভাষিক ট্যাবুতে। নজরুল চলে গেলেন হিন্দু বনাম মুসলমান বৈপরীত্যের একদম বাইরে। বাংলা ভাষায় সম্ভবত এই প্রথম কোনো কবি কবিতায় যোগ করে দিলেন স্থান, কাল ও পাত্রের বিশিষ্ট বিবরণ; যেমনটা ঘটে থাকে সাধারণত নাটকের বেলায়।
টানা গদ্যে 'কামাল পাশা' কবিতায় লিখেছেন, 'তখন শরৎ-সন্ধ্যা। আস্‌মানের আঙিনা তখন র্কা‌বালা ময়দানের মতো খুনখারাবির রঙে রঙিন।' যেন পাঠককে প্রস্তুত করে নিচ্ছেন কবিতার জন্য। একটু পরেই সৌনিকের গলায় উঠে এলো বিজয়-উন্মত্ত চিৎকার, 'ওই ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই।' 'আনোয়ার' কবিতার শুরুতেই তৃতীয় বন্ধনীতে নজরুল লিখেছেন, 'স্থান - প্রহরী-বেষ্টিত অন্ধকার কারাগৃহ, কনস্ট্যান্টিনোপ্‌ল।/ কাল - অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি।' তারপর আবার তৃতীয় বন্ধনী, তার ভেতর জুড়ে দিয়েছেন স্থান ও কালের গদ্যভাষ্য, 'চারিদিকে নিস্তব্ধ নির্বাক। সেই মৌনা নিশীথিনীকে ব্যথা দিতেছিল শুধু কাফ্রি-সান্ত্রীর পায়চারির বিশ্রী খট্‌খট্‌ শব্দ। ঐ জাতীয় জিন্দানখানায় মহাবাহু আনোয়ারের জাতীয়- সৈন্যদলের সহকারী এক তরুণ সেনানী বন্দী।' আরও খানিকটা প্রতিবেশ বর্ণনার পর শেষ বাক্যে লিখলেন, ''তরুণ বন্দী চীৎকার করিয়া উঠিল, 'আনোয়ার!'-।'' অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে শুরু হয়ে গেল ছন্দে বাঁধা উচ্চারণ, 'আনোয়ার! আনোয়ার!/ দিলাওয়ার তুমি, জোর তলওয়ার হানো, আর/ নেস্ত-ও-নাবুদ করো, মারো যত জানোয়ার!/ আনোয়ার! আফসোস্‌!' গদ্যপদ্যের এই সন্ধিকে আমাদের মনে রাখতে হবে।
সমস্যা হলো, নজরুল অথবা অগ্নি-বীণাকে যতটা রাজনীতি ও সমাজতত্ত্বের জায়গা থেকে আমরা মনে রাখি, ততটা মনে রাখি না প্রকৃত 'সাহিত্যিক' কারণে। কী কৌশলে, কোন পদ্ধতিতে বাস্তবতার সাহিত্যিক অপরিচিতকরণ ঘটালেন, তার হদিস আমরা তেমন একটা নেই না। দূর ইতিহাসে নজরুলের একদল অনুরাগী ও অনুকারীর উদ্‌গম ঘটলেও আধুনিকতাবাদীরা এগিয়ে গেলেন না 'নজরুলী ভাষা'র কোনো তৃতীয় কোনো নিরীক্ষায়। বাঙালির নন্দনতাত্ত্বিক রীতি ও পদ্ধতিতে নজরুলের কাব্যভাষার সংযোজন কী- এ বিষয়ক তদন্ত ও পর্যালোচনার হার কম বলেই অনুমিত হয়। তাহলে কি আমরা তাঁকে পড়ার বদলে সঁপে দিয়েছি মহাকালের হাতে? আদতে আমরা কি অগ্নি-বীণা পড়ি? নাকি বইটির কপালে শাশ্বতের মহিমা জুড়ে দিয়েই ক্ষান্তি মেনেছি? এ কালের পাঠক সত্যিই কি অগ্নি-বীণার পাতা ছুঁয়ে দেখেন?
আমার সন্দেহ জাগে, সাহিত্যের- বিশেষত বাংলা সাহিত্যের নিবিষ্ট পড়ূয়ারা বাদে কতজন পাঠক নজরুলের কবিতার সঙ্গে সংলগ্নতা বোধ করেন? সম্ভবত নিবিড়ভাবে অসংলগ্ন থাকেন। হয়তোবা 'শুদ্ধতম কবি'রা সংযুক্ত হতে চান না অগ্নি-বীণার ভাব ও ভাষার সঙ্গে। বাংলা কবিতার ইতিহাসের চত্বরে প্রবেশ করতে চাইলেও যে অগ্নি-বীণা পড়ে দেখা দরকার- সেই উপলব্ধির তাড়নাও খুব বেশি অনুভূত হতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। অর্থাৎ যে রাজনীতি ও সামাজিক উপযোগ ফুরিয়ে গেছে (ফুরিয়ে গেছে কি?) সেই প্রেক্ষাপটের কবিতা আর কাউকে উদ্দীপিত করছে না। আমার একান্ত ব্যক্তিক দেখা, শোনা ও জানা থেকে এ রকম একটি সিদ্ধান্তে আসা যায়।
কেন পড়ি না? তার সংগত কারণ আরও নিশ্চয়ই আছে; আমাদের কাব্যরুচির বদল ঘটেছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যেমন কবিতার কাছে বিশেষভাবে চেয়েছিলেন 'রহস্যময়তা'; নজরুলের কবিতায় তারা তা পাননি। পেয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশের কাছে। নজরুলের কালেই আধুনিকতাবাদী কবিতার নতুন স্তম্ভ্ভ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল, বাস্তব ও ঐতিহাসিক সময়পরিধিরও বিচিত্র প্রসার ঘটেছিল। নজরুল পরিবর্তমান আধুনিকতার অংশী হননি, আদতে হতে চাননি। কিন্তু রবীন্দ্র অধ্যুষিত বাংলা কবিতার মানদণ্ডকে ভেঙে দিয়ে নতুন একটি আদর্শ তৈরি করতে পেরেছিলেন। অগ্নি-বীণা পরে আছে আদর্শ ভাঙা ও নির্মাণের সেই জয়ের তিলক, একশ বছর পরও যা ম্লান হয়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এ রকম কিছু জয়টীকা টিকেই থাকে। কেউ যদি এক মুহূর্তের জন্যও সেসব না পড়ে থাকেন, বহুকাল যদি অস্পর্শিতও থেকে যায় সেই সব গ্রন্থ তাতে করে ওই সব সৃষ্টি ও স্রষ্টার ঐতিহাসিক স্থানচ্যুতি ঘটে না। বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অগ্নি-বীণা সে রকম একটি বই হয়ে আছে; হয়তো আরও কয়েকশ কাল ফুরিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

×