ছাই-বালু থেকে সোনা-রুপা
গাজী আনিস
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৩ | ১৮:০০
‘যেখানে দেখিবে ছাই
উড়াইয়া দেখ তাই,
পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন।’
কবি গগন হরকরার (গগন চন্দ্র দাস) এই উক্তি যেন সত্য হয়ে ওঠে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রামে। সেখানে ছাই বালু থেকে বের হয় সোনা-রুপা। এ কাজে যুক্ত আছেন গ্রামের শত শত মানুষ।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্বর্ণকারের দোকান থেকে ছাই-বালু সংগ্রহ ও তা থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বের করা হয় সোনা ও রুপা। তবে সংগৃহীত উপাদান থেকে এসব ধাতুর দেখা পেতে করতে হয় হাড়খাটুনি।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে ছাই-বালু শুকানো, ঢেঁকিকোটা, পানিতে আবর্জনামুক্ত করা ও আগুনে গলানোর মতো কয়েক ধাপের কঠিন শ্রম। বিভিন্ন জেলা ঘুরে ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করেন ছাই-বালু। তবে সব ছাই-বালু থেকে সোনা-রুপা বের হয় না। মূলত স্বর্ণকারের দোকানের ছাই-বালুই সোনা-রুপা বের করার মূল উপাদান। এ জন্য বেশ মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় স্বর্ণকারদের।
সরেজমিন দেখা যায়, ৪০ বছর ধরে সোনা-রুপার মতো মূল্যবান ধাতুর খোঁজ করছেন দুলাল বেপারী। ছাই-বালুতে সোনা-রুপা আছে কিনা দেখেই সহজে অনুমান করতে পারেন তিনি। পূর্বপুরুষের কয়েক প্রজন্ম ধরে এই কাজ করছেন তাঁরা। তবে বর্তমানে আগের মতো আয়-রোজগার নেই বলে জানান তিনি। এ কারণে ছেলে-মেয়েদের আনেননি নিজের পেশায়।
ছাই-বালুর ব্যবসায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্ত আছেন দেলওয়ার বেপারী। তিনি বলেন, যে দোকানে ২০ থেকে ২৫ জন কারিগর থাকে, বছরে সেখানকার ছাই-বালু দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি হয়। আবার দু’জন কারিগরের দোকানের মাল কেনা যায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। ছাই-বালু কিনতে আমরা বিভিন্ন জেলায় যাই। বৈশাখ ও কার্তিক মাসে অনেকটা জমজমাট থাকে।
চারিগ্রামের আরেক ব্যবসায়ী ফরিদ বেপারী বলেন, আমি রিস্ক নিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার মালও কিনেছি। কখনও লাভ হয়, কখনও আবার টানাটানি বেঁধে যায়। ৩০ কেজির মালপত্র ও পাঁচ দিনের পরিশ্রম থেকে কখনও কখনও এক ভরি সোনা ও রুপা মিলতে পারে। সাধারণত ছয় মাস থেকে এক বছর পরপর একটি দোকানের মালপত্র কিনি।
তবে এই ব্যবসার লাইসেন্স না থাকায় অনেক সময় হয়রানির শিকার হতে হয় বলে জানান এই ব্যবসায়ীরা। বলেন, যখন ছাই-বালুর বস্তা নিয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়িতে চড়ে আসি, পুলিশ এগুলো খুলে দেখতে চায়। বাধ্য হয়ে রাস্তায় এগুলো ঢালা লাগে। তখন মালপত্র অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়।
ছাই-বালু থেকে সোনা-রুপা বের করতে সিসা, চুন, তুষের ছাই ও এসিড প্রয়োজন হয়। ছাই-বালু থেকে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় উপাদান আলাদা করে মূল উপাদান নিয়ে সিসা দিয়ে আগুনে জ্বালানো হয়। এরপর সোনা ও রুপা একসঙ্গে থেকে যায়। নাইট্রিক এসিড দিয়ে সোনা-রুপা পৃথক করা হয়।
এ ছাড়া স্বর্ণকারের কারণেও অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে জানান এ ব্যবসায়ীরা। তাঁরা জানান, ‘স্বর্ণকারের দোকানের কারিগররা অনেক সময় ফাঁকি দেয়। দাম বেশি রাখে। মাল থেকে স্বর্ণের মিহি কণা নিজেরা কুড়িয়ে নিয়ে সেখানে কিছু আবরণ ছড়িয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। এ জন্য আমরা পরিশ্রম করেও ঠিকমতো সোনা-রুপা পাই না। যে কারণে বিভিন্ন সময় খতিগ্রস্ত হই।’
তবে এই ব্যবসায় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও আছে। ব্যবসায়ীরা জানান, নাইট্রিক এসিড দিয়ে সোনা আলাদা করায় অনেকটা রিস্ক থাকে। অনেকে দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন।
তবে ভবিষ্যতে এই পেশা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন ছাই ব্যবসায়ীরা। কারণ গহনা তৈরিতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। তাই গহনা তৈরির সময় ক্ষুদ্র কণা কম ঝরে। এ জন্য ছাই-বালু থেকে শত চেষ্টার পরেও কাঙ্ক্ষিত ধাতু মেলে না। এ জন্য অনেক সময় বেশি দামে মালপত্র কিনে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
