শিল্পকলা
দ্য টু ফ্রিদাস: ফ্রিদার শক্তি ও প্রতিবাদ
‘দ্য টু ফ্রিদাস’
এইচ বি রিতা
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০
ফ্রিদা কাহলো-ইতিহাসের এমন একজন চিত্রশিল্পী, যিনি নিজেই নিজেকে নিয়ে আঁকতেন। তাঁর শৈলী সব সময় ছিল মূর্তিবাদী এবং স্ব-শিক্ষিত, কল্পনাপ্রসূত উপাদান এবং তার নিজস্ব ব্যক্তিগত, জীবনীগত দৃষ্টিভঙ্গির উপর জোর দিয়ে করা। ফ্রিদা কাহলোর চিত্তকল্পগুলো মেক্সিকান শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্থান দিয়েছে। তাই হয়তো নিজের স্ব-প্রতিকৃতি নিয়ে আঁকা সম্পর্কে ফ্রিদা বলেছিলেন, “আমি নিজেকে আঁকতে পারি কারণ আমি প্রায়শই একা থাকি এবং আমি এমন একজন যার সম্পর্কে আমিই সবচেয়ে ভাল জানি।” দ্য টু ফ্রিদাস (The Two Fridas) চিত্রকল্পটি ফ্রিদা ১৯৩৯ সালে এঁকেছিলেন। দ্য টু ফ্রিদাস- ফ্রিদার স্ব-প্রতিকৃতির সবচেয়ে স্বীকৃত রচনাগুলির মধ্যে একটি, যা তিনি দিয়েগো রিভেরা সাথে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদের পর এঁকেছিলেন। ফ্রিদার ডায়রিতে, তিনি এই পেইন্টিং সম্পর্কে লিখেছেন যে, এটি তার শৈশবের একটি কাল্পনিক বন্ধুর স্মৃতি থেকে উদ্ভূত করা হয়েছে। এরপরে তিনি জানিয়েছিলেন যে, এটি তাঁর দিয়েগোর সাথে বিচ্ছেদর পর হতাশা এবং একাকিত্বকে প্রকাশ করেছে। এই প্রতিকৃতিটি ফ্রিদার দুটি ভিন্ন ব্যক্তিত্বকে দেখায়। এটি একটি ডবল সেলফ-পোর্ট্রেট, যেখানে দুইজন ফ্রিদা একসাথে হাত ধরে বসে আছেন। একজন সাদা ইউরোপীয়ান-শৈলীর ভিক্টোরিয়ান পোশাক পরেছেন এবং অন্যজন ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান তেহুয়ানা পোশাক পরেছেন। উভয় ফ্রিদার কোলে একটি জিনিস রাখা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ফ্রিদা দিয়েগো রিভারার একটি ছোট প্রতিকৃতি ধরে আছেন। এবং ইউরোপীয়ান ফ্রিদা কাঁচি ধরে আছেন। উভয় ফ্রিদার হৃদয় উন্মুক্ত। প্রধান ধমনী- ঐতিহ্যবাহী ফ্রিদার ছিঁড়ে যাওয়া উন্মুক্ত হৃদয় থেকে বের হয়ে হাতের চারপাশ আবৃত্ত করে স্বামীর শৈশবের ছবির সাথে যুক্ত হয়েছে এবং ইউরোপিয়ান ফ্রিদার হৃদয়ের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। ইউরোপিয়ান ফ্রিদা কাঁচি দিয়ে সেই ধমনী কেটে ফেলেছেন এবং রক্তনালী থেকে তাঁর সাদা পোশাক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ফ্রিদা তাঁর শিল্পে খুব স্পষ্টতরভাবে নিজের দ্বৈতসত্তাকে উপস্থাপন করেছেন। এক সত্তায় ফ্রিদা দুর্বল, অতীতে বাস করছেন(ঐতিহ্যবাহী ফ্রিদা)এবং আরেক সত্তায় ফ্রিদা আধুনিক এবং শক্তিশালী(ইউরোপিয়ান ফ্রিদা)। উভয় ফ্রিদার হৃদয় দুটো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান ফ্রিদার হৃদয়টি অক্ষত দেখাচ্ছে, যেখানে ইউরোপীয় ফ্রিদার হৃদয়টি কাটা। এখানে দুটি পৃথক ব্যক্তিসত্তা দিয়েগোর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর ফ্রিদার ভেতরের ব্যথাকে উপস্থাপন করছে এরং একই সাথে নিজেকে ভিন্নরূপে দাড় করাতে ফ্রিদার ক্রমাগত লড়াইকেও উপস্থাপন করছে। তেহুয়ানা পোশাকে ঐতিহ্যবাহী ফ্রিদা হল সেই একজন, যাকে তাঁর স্বামী দিয়েগো রিভেরা ভালোবাসতেন। তাই তাঁর হৃদয়টি সুস্থ ও অক্ষত দেখায় এবং হাতে ছোট দিয়েগোর একটি প্রতিকৃতিটি রয়েছে, অর্থাৎ ফ্রিদা তখনো দিয়েগোর পছন্দগুলোর সাথে তাঁর অস্তিত্ব ও অতীতকে ধরে আছেন। এটি একদিকে দিয়েগোর প্রতি ফ্রিদার প্রেম, আনুগত্য প্রকাশ করে, আবার অন্যদিকে এটি তাঁর দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে, যেখানে তিনি বিচ্ছদের পর ও দিয়েগো কে ভুলতে পারছেন না। পোশাকের ভিন্নতায় এই চিত্রকল্পটি ফ্রিদার অতীতের ভিন্ন কিছুকেও প্রতিনিধিত্ব করে। একজন স্বামী হিসাবে, দিয়েগো রিভেরা ফ্রিদাকে নিজের মত করে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পছন্দ করতেন। তিনি আশা করতেন যে, ফ্রিদা একজন আদর্শ ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান স্ত্রীর ভূমিকা পালন করবেন। বিয়ের আগে ফ্রিদা ইউরোপীয়ান স্টাইলের পোশাক পরতেন। কিন্তু বিয়ের পর ফ্রিদার ঐতিহ্যবাহী পোশাকটি ছিল মূলত দিয়েগোর পছন্দ। দ্য টু ফ্রিদাস- চিত্রকর্মটি সেই ভূমিকার প্রতিবাদ করে। এখানে দ্য টু ফ্রিডাস-চিত্রকল্পে ইউরোপীয়ান ফ্রিদার পোশাকটি তাঁর পছন্দ ও সিদ্ধান্ত নেবার দিককে নির্দেশ করে। অর্থাৎ তিনি এখন তাঁর নিজ জীবনের দায়িত্বে আছেন। এটি নারীর প্রতিবাদকেও দেখায়। দ্য টু ফ্রিডাস- চিত্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ভারসাম্য, অনুপাত, জোর এবং বৈসাদৃশ্য। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দুই ফ্রিদার পিছনে একটি উত্তেজিত মেঘে ভরা ঝড়ো আকাশ, যা ফ্রিদার ভেতরের অশান্তিকে প্রতিফলিত করে। আবার একই সময়ে উভয় ফ্রিদার হাত একে অপরের দ্বারা ধরে রাখা হয়েছে, যা একতার প্রতীক। যদিও দুটি চিত্রের পার্থক্য রয়েছে, তবু তারা উভয়ই একটি ফ্রিদা এবং একসাথে তারা স্ব-প্রতিকৃতি তৈরি করে। দ্য টু ফ্রিদাস পীড়াদায়ক ছবি। তবে এর স্পষ্টতা সত্যেরই প্রকাশ। একাধিক শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে লড়াই করে বিশ্ববাসীর কাছে তারকা শিল্পী হিসাবে পরিচিত ফ্রিদা কাহলো। ফ্রিদা কাহলোর অক্ষমতার লড়াইয়ের শুরু সেই শৈশব থেকেই। ফ্রিদা পোলিওতে আক্রান্ত হয় ছয় বছর বয়সে, যার কারণে তাঁর দুটো পা সরু এবং ছোট হয়ে যায়। ১৮ বছর বয়সেনড়ক দুর্ঘটনায় ফ্রিদার মেরুদণ্ডের কলাম, কলারবোন, পাঁজর, পেলভিস, ডান পা’য়ের ১১টি জায়গা ভেঙে যায় এবং তাঁর কাঁধটি স্থানচ্যুত হয়। তীব্র যন্ত্রণা ভুলে থাকার উপায় হিসেবে ফ্রিদা ছবি আঁকতে শুরু করেন। বাবা-মা তাকে বানিয়ে দেন কাঠের ইজেল, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছবি আঁকার মতো সকল ব্যবস্থা করে দেন। বেশিরভাগ সময় তিনি ঘরের আয়নায় নিজেকে দেখে নিজের প্রতিকৃতি আঁকতেন ফ্রিদা। ফ্রিদা কাহলো ১৯০৭ সালে জুলাইয়ের ৬ তারিখে মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই চিকিৎসাকালীন আনুমানিক ছয়টায় তাকে নার্স বিছানায় মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
- বিষয় :
- শিল্পকলা
- এইচ বি রিতা