পরীক্ষার ফল ও শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা
ব্যর্থতাই শেষ কথা নয়
সমাজের কান কথা না শোনে বদলে ফেলুন নিজেকে... ছবি: সমকাল
আলাউদ্দিন আলাদিন
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে দেখা যায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়েছে ফেলের সংখ্যা। পরীক্ষায় ফেলের পর মনে ভর করে হতাশা। সেই থেকে আত্মহত্যার মতো করুণ ঘটনা চোখে পড়ে আমাদের। পরীক্ষার গৎবাঁধা কিছু প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া যদি ব্যর্থতার সমার্থক হয় তবে জেনে রাখুন, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং অভিভাবকদরে চোখে চোখ রেখে এই ফেল্টুসরাই বদলে দিয়েছে মানবসভ্যতা! পৃথিবী বদলে দেওয়া সেই ফেল্টুসদের একজন আপনি; আপনার জন্যই লিখেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন
১০ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ছয় শতাংশ কম। জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। শিক্ষা বিশ্লেষকদের হিসাবে, ২০০৭ সালের পর এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম। ছয় লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী এবার ফেল করেছে, আর দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।
ফলের ভয়াবহতা!
সংখ্যাগুলো শুকনো পরিসংখ্যান মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে লাখো পরিবারের কান্না, হতাশা আর ভয়। কারণ প্রতিবারের মতো এবারও ফল প্রকাশের পরপরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে মর্মান্তিক সব খবর, যেখানে ফল খারাপ করার পর কিশোর-কিশোরীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। রাজশাহী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুরসহ একাধিক জেলা থেকে এমন ঘটনার খবর এসেছে গত কয়েক দিনে।
পাঁচ বছরের চিত্র যা বলছে
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২২ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এরপর ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশে, ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে হয় ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে হঠাৎ বড় ধাক্কা লাগে, পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। এবার ২০২৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে।
অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এর মানে, প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এসএসসিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে ফিরছে। এটি শুধু একজন-দুজনের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সামষ্টিক বাস্তবতা, যা নিয়ে গোটা সমাজের ভাবা দরকার।
বিশ্লেষকদের মতে...
গবেষক ও লেখক গওহার নঈম ওয়ারা সম্প্রতি সমকালের গোলটেবিলে বলেন, ফল প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায়। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ফল প্রকাশের এক দিনের মধ্যেই ১৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে, যাদের বেশির ভাগই ছিল মেয়ে। তিনি এটাও উল্লেখ করেন, একজন আত্মহত্যা করলে গড়ে আরও অন্তত দশজন এমন চেষ্টা চালায় বলে ধারণা করা হয়, অর্থাৎ প্রকৃত সংকট প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সবাই যে ফেল করেই এই পথ বেছে নেয় তা নয়। আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা তানসেন রোজের মতে, পরীক্ষায় আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মেয়ে। এর পেছনে প্রধান কারণ তিনটি–প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার অপরাধবোধ বা লজ্জা, পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ এবং আশপাশের মানুষের সঙ্গে তুলনা। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যে শিক্ষার্থী আসলে পাস করেছে, নিছক গুজব বা সহপাঠী-

শিক্ষকের তির্যক মন্তব্যের চাপে পড়েই সে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, ফল প্রকাশের পর দেখা গেছে সে আসলে উত্তীর্ণ। এ থেকে বোঝা যায়, বাস্তব ফলের চেয়ে সামাজিক চাপ আর লোকলজ্জার ভয়টাই বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। গওহার নঈম ওয়ারা আরও বলেন, ফল প্রকাশের পর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া নিষ্ঠুর মন্তব্য বা অনলাইন হয়রানি কিশোর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তাঁর মতে, গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে; শুধু মর্মান্তিক খবর প্রকাশ না করে ফল প্রকাশের আগে-পরে সচেতনতামূলক লেখাও প্রকাশ করা দরকার।
কেন এই বয়সে জীবন দিতে হচ্ছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরীর মতে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত জিপিএ বা ভালো ফলকারীদেরই মূল্যায়ন করে, আর পরীক্ষায় খারাপ করাকে এমনভাবে সামাজিকভাবে কলঙ্কিত করা হয় যে কোমলমতি শিশুরা তীব্র চাপে ভেঙে পড়ে। শিশুরাই সব সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকারও একই সুরে বলেন, পরিবারে সচেতন অভিভাবকত্বের বড় ঘাটতি রয়েছে; সন্তানের ফল খারাপ হলে বকাঝকা কিংবা কোনো কোনো পরিবারে মেয়ের বাল্যবিবাহের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়, যা কিশোর-
কিশোরীদের গভীর মানসিক সংকটে ফেলে। বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠনগত কারণেই কিশোর-কিশোরীরা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাই একটি খারাপ ফলকে তারা মুহূর্তের মধ্যে জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ভেবে বসতে পারে। অথচ বাস্তবতা হলো, এসএসসির একটি সনদ কখনোই কারও মেধা, যোগ্যতা বা ভবিষ্যতের একমাত্র মাপকাঠি নয়।
ফেল করেও যারা বদলে দিয়েছেন পৃথিবী
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পৃথিবী বদলে দেওয়া বহু মানুষই একসময় পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা প্রথাগত শিক্ষায় ভালো করতে পারেননি। আলবার্ট আইনস্টাইন–বিজ্ঞানের ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারিত হয় সবচেয়ে বেশি, তিনিও ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। স্টিভ জবস ও বিল গেটস-–দুজনেই কলেজের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিলেন, অথচ তাঁদের হাত ধরেই এসেছে প্রযুক্তির যুগান্তকারী পরিবর্তন। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্কুলজীবনে ছিলেন দুর্বল ছাত্র, এমনকি একবার ভর্তি পরীক্ষায়ও ব্যর্থ হয়েছিলেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামও তাঁর ছাত্রজীবনে একাধিকবার ভালো ফল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
এই মানুষগুলো যদি একটি পরীক্ষার ফলকেই জীবনের শেষ ধরে নিতেন, তাহলে আজকের পৃথিবী অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত থেকে যেত।
বদলাতে হবে সমাজ, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মিলিয়ে দেখলে বদল দরকার কয়েকটি জায়গায়। সাফল্যের সংজ্ঞা বদলাতে হবে। শুধু জিপিএ দিয়ে নয়, খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা কিংবা অন্য যেকোনো দক্ষতাকেও সমানভাবে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার, যাতে শিক্ষার্থীরা হার-জিত স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে শেখে। অভিভাবকদের আচরণ বদলাতে হবে। সন্তানের খারাপ ফলের খবরে বকাঝকা বা তুলনা নয়, বরং পাশে থেকে ভরসা দেওয়াটাই এখন সবচেয়ে জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষকদের কিশোর মনস্তত্ত্ব বোঝার প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, এবং ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেভাগে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। পাশাপাশি এ বিষয়ে দেশে ধারাবাহিক গবেষণারও ঘাটতি আছে, যা পূরণ করা জরুরি।
কিছু করে দেখানোর আগুন
তাই আজ যারা পরীক্ষায় ফেল করে মন খারাপ করে বাড়ি বসে আছ, তাদের বলি, তুমিই বদলাতে পারবে সমাজ। তুমি এমন কিছু দিতে পারবে সমাজকে যা পাস করা অন্য হাজারজন দিতে পারবে না। আর অভিভাবকদের বলি, ফেল করা আপনার সন্তানকে না বকে বরং চোখে আঙুল দিয়ে এই ফেল্টুসদের দেখিয়ে দিন। মনে জ্বালিয়ে দিন কিছু করে দেখানোর আগুন। হয়তো তার প্রতিভা আর অধ্যবসায় সমাজ আর সভ্যতাকে দেখাবে নতুন পথ; কারণ এটিই বলে ইতিহাস!
- বিষয় :
- পরীক্ষা
- এসএসসি পরীক্ষার্থী
- আত্মহত্যা