বিশ্ব বাঘ দিবস
পড়শি বাঘ
আঁখি সিদ্দিকা
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০
২০০ বছর আগের বাংলাদেশেও আমরা জলাজঙ্গলাকীর্ণ এক বনভূমির দেখা পাই। জঙ্গলে বাঘসহ অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে বসবাস কার্যত এক শিল্পের পর্যায়। যেখানে মানুষ শিখেছে অপরের সঙ্গে বেঁচে থাকার এক ভিন্ন কৌশল। লিখেছেন আঁখি সিদ্দিকা
উপমহাদেশের প্রধান নদীগুলোর মোহনা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান উর্বর এলাকা। আকারে ছোট হলেও এখানে তিন ধরনের বন গজিয়ে উঠেছে। শালের জঙ্গল, মিশ্র বৃষ্টিপাতের জঙ্গল আর ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। ফলে এ অঞ্চল পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর খনি হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশরা একবাক্যে বলতেন, বাংলাদেশে এমন কোনো এলাকা ছিল না, যেখানে বাঘ ছিল না (হাতিয়া, সন্দ্বীপ বাদে)। পুরো বাংলাদেশের কৃষককে বাঘের সঙ্গে ভাগাভাগি করেই চলতে হয়েছে। পর্যটকদের বিবরণীতে পাওয়া যায়, ডোরাকাটা বাঘ সাধারণত ক্ষেত, খোলা বা গ্রামীণ জঙ্গলে খুব একটা আসত না। এরা একটা নিরবচ্ছিন্ন বনভূমি পছন্দ করত।
বাঘ প্রধানত প্রকৃতিনির্ভর প্রাণী হলেও, বেড়ে ওঠার অনেক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় বলে তাকে যথেষ্ট বুদ্ধিমান হতে হয়। প্রখর ইন্দ্রিয়ের, দ্রুতগামী এ প্রাণীটি শিকার করে শুধু দাঁত-নখ দিয়ে। দূরপাল্লার দৌড়ের মতো তার দেহের গড়নও নয়। তার গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা খারাপ। এ অবস্থায় গড়ে প্রায় ২০ বার শিকারের পিছু নিয়ে মাত্র একবার সে সফল হয়। সফল হতে হলে শিকারের অগোচরে খুব কাছে গিয়ে তাকে চমকে দিতে হয়। শিকার চমক কাটিয়ে ওঠার আগেই বাঘকে শিকার ধরে ফেলতে হয়। সময়ের সামান্য হেরফেরে বাঘকে উপোস থাকতে হয়।
মেডিকেল সার্জন জেমস টেলর লিখেছেন, এ দেশে বর্ষাকালে খুব বাঘের উপদ্রব হতো। জনসাধারণের গরু, মোষ তো মরতই, মানুষও মারা পড়ত বাঘের হাতে। বাঘের অত্যাচারে জনপদ উজাড় হয়েছে, এমন খবরও পাওয়া যায়। এর ফলে সরকারি রাজস্ব আদায় কমে যেত। বাঘ মারার জন্য মোগল আমল থেকেই একদল পেশাদার শিকারি নিয়োগ করা হতো সরকারি খরচায়।
সম্প্রতি সুন্দরবনের ঢেংমারী গ্রামে কথা হয় স্থানীয় শ্রীপতি বাছারের সঙ্গে। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, বাঘের বসতির পাশে কী করে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াইটা কোথায়। তিনি বলেন, ‘আমরা এই বনে, এই গ্রামে বসবাস করছি; কিন্তু আমার দাদার বাবারা প্রথমে এইখানে ছিল না, আমরা বেশির ভাগ ছিলাম ইন্ডিয়ার ওই সাইডটায়। ওইখানে তখন একবার অজন্মা হলো। অজন্মা মানে– ফসলাদি হচ্ছিল না, ছেলেমেয়েদের কীভাবে বাঁচায়, তখন নৌকায় ভাসতে ভাসতে এখানে চলে এলো, নৌকা ধরে ডাঙ্গায় উঠে বন কাটা শুরু করল। বন তো এখনকার মতো ছিল না। যেমন ছিল বাঘ, কুমির, সাপ; তেমনি ঘন ছিল বন। তখন কেটে কেটে বসতি শুরু করল। মাটিতে ঘর করা যেত না। টং করে সেইখানে থাকতে হতো। বন যে যতটা কাটবে, তার ততটা জমি। আমার বয়স তখন ১২ বা ১৩, বাঘের ভয়ে বাইরে বাইর হতে পারতাম না। এখানে কী পরিমাণ বাঘের উপদ্রব সে বলার মতো না। সব কিছুর ভয়– বাঘ, কুমির, সাপ এমনকি নাম না জানা কত প্রাণী। রাস্তা ছিল না, বসতি ছিল কম। কয়েকটা পরিবার মিলে দলবদ্ধ হয়ে থাকতে হতো। একবার আমার ঠাকুরদা বাজুয়ার বাজার থেকে সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফেরার সময় বাড়ির ঘাটে এসে নৌকা ভেড়াল; কোথা থেকে বাঘ এসে তারে আক্রমণ করল, খেল না। ফেলে গেল, কিন্তু তাঁকে আর বাঁচানো গেল না। আমার ঠাকুমা এই দৃশ্য দেখে কাঁথা মুড়ি দিয়ে সেই যে শুলো, পরের দিন সকালে সেও মরে গেল। বাঘের ভয়েই সে মরে গেল।’
ঢেংমারী গ্রামে সর্বশেষ বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে আসা ব্যক্তি দেবেন। তাঁর একটা কান নেই। আক্রান্ত ব্যক্তি জীবিতের মধ্যে দেবেন। ওরা তিন-চারজন কাঠ কাটতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হলেন। তাদের মধ্যে তিনজন গাছে উঠে গেছেন, দেবেন উঠতে পারেননি। দেবেনকে উঁচু করে ধরে শূন্যে যখন তুলেছে, তখন গাছের ওপর থেকে একজন বাঘের পিঠের ওপর কুড়াল মেরেছেন, তখন বাঘ দেবেনকে ছেড়ে বনের দিকে পালিয়েছে, দেবেন বেঁচে রয়েছেন। দেবেন গান গেয়ে অর্থ রোজগার করেন, বনে আর যান না।
ক্ষুধার্ত না হলে বাঘ আক্রমণ সাধারণত করে না। বাঘ কিছুটা বেখেয়ালি। আপনি পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন সে দেখবেও না। কিন্তু ১০ জনের মধ্যে আপনাকে দূর থেকে টার্গেট করলে ও ঠিক আপনাকে ধরে ফেলবে। বাঘের মনস্তত্ত্ব এখনও মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। তবে কিছু আচরণের খোঁজ পেয়েছে। যে বাঘ একবার মানুষের মাংসের স্বাদ পেয়েছে, সে তারপর থেকে মানুষ মারার চেষ্টা করেই চলবে; প্রতি সপ্তাহে একজন না একজন মানুষ মারবে। বাঘটি মানুষখেকো না হলে এবং লোকালয়ের আশপাশে চলাচলে কিছুটা অভিজ্ঞ হলে গাছপালার আড়াল নিয়ে কিছুটা এগিয়ে এসে স্বাভাবিক ঔৎসুক্যে দেখতে চায়, কে এলো। জঙ্গলের পথে মানুষ ও বাঘের সামনাসামনি দেখা হয়ে গেলে পরিস্থিতি অন্যরকম হয়– বাঘ কিছুতেই পিছু হটবে না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। অপছন্দ হলে লেজ নাড়বে– ধমকানো হাঁক দেবে। বাচ্চা সঙ্গে থাকলে কিছুটা এগিয়ে আসবে, আবার পেছাবে। বাঘ তার মারা জীবজন্তু পাহারায় থাকলেও একই কাজ করবে।
২০০৬ সালের কথা। একটা গবেষণার কাজে কয়রার বানিয়াখালী এলাকায় লেখক তিন মাস ছিলেন হড্ডা নদীর পাড়ে। সেখানে বিজন কাকু ও রাজলক্ষ্মী মাসি থাকতেন তাদের জ্ঞাতি নিয়ে। তাদের ঘরগুলো মাটি থেকে ফুট চারেক উঁচু গেউয়ার বল্লির ওপর তোলা মাচাঘর। ঘরের সামনের দিকটায় খোলা মাচা। পেছনের ঘরটি এত ছোট যে, সেখানে দু-তিনজনের বেশি মানুষের স্থান সংকুলান হওয়ার কথা নয়। বিজন কাকু রাতে ঘুমান ওখানে আর বাইরের খোলা মাচায় ঘুমান অন্য মৌয়ালরা।
প্রায়ই দেখতাম বিজন কাকুর সেই ঘরের পাশে বাঘের পায়ের তাজা ছাপ। বাঘ রাতে এ পথে হেঁটেছে, বিজন কাকুর ঘর থেকে মাত্র চার-পাঁচ ফুট দূর দিয়ে। এদিকটায় বাঘ আসে শিকারের খোঁজে। কাকুর বাড়ির সামনে যে ফাঁকা মাঠের মতো এলাকাটা, সেখানে রাতে হরিণের দল আশ্রয় নেয়। এখানকার গেউয়াবনের আড়ে আড়ে বাঘ ঘোরে হরিণের আশায়। বাঘ ইচ্ছা করলেই বিজন কাকুর বারান্দায় যারা ঘুমান, তাদের যে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে। কখনও তা করেনি। যারা প্রতিদিন কাজ করে তাদের বাঘ দেখে কিন্তু কিছু করে না। লেখক একটি খালের নাম দিয়েছিলেন ‘মায়া খাল’। অসম্ভব সুন্দর। সেই খালে জেলেরা ছোট ছোট নৌকায় রাত কাটান। বাঘ তাদেরও কখনও ধরার চেষ্টা করেনি।
সুন্দরবন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি প্রায় ১৫ বছর। সুন্দরবন রক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজ, মৌয়ালদের জীবন, পরিবেশ ও প্রকৃতি। এ ছাড়া সুন্দরবনের শরণার্থীদের নিয়ে। বারবার সুন্দরবনে গিয়ে মনে হয়েছে, যার বাড়ি তার খবর নাই পাড়া-পড়শির ঘুম নাই। সুন্দরবন আসলে বাঘের বাড়ি। সেই বাঘের বাড়ির বাঘ হারাতে বসেছে। তাদেরই অনিশ্চিত জীবন শুরু হয়ে গেছে।
১০০ বছর আগে পৃথিবীতে বাঘ ছিল এক লাখেরও বেশি। বর্তমানে সে সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৯০০টিতে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জরিপ অনুসারে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। তিন বছর পর ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে ১১৪টি বাঘের অস্তিত্ব চিহ্নিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সর্বশেষ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে সুন্দরবনে বাঘের ক্যারিং ক্যাপাসিটি (সুষম ধারণক্ষমতা) অর্জনের চেষ্টা করছে বন বিভাগ। টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের ক্যারিং ক্যাপাসিটি ২৫০টি। বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার প্রবণতা চলমান থাকলে আগামী কয়েক দশকে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আসুন, সুন্দরবন রক্ষা করি, যত্ন করি আর প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে বাঘ বাঁচাই!
- বিষয় :
- পড়শি বাঘ
- বিশ্ব বাঘ দিবস
