ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা: যা জানতে হবে

ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা: যা জানতে হবে
×

জিয়া হাসান

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এতে শ্বাসনালি ও ফুসফুস সংক্রমিত হওয়ায় রোগীর জ্বরের পাশাপাশি শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা যেমন– ঠান্ডা, কাশি, নাকে পানি দেখা দেয়। প্রকৃত ফ্লু হয়ে থাকে ইনফ্লুয়েঞ্জা নামক ভাইরাস দিয়ে। আরও কিছু ভাইরাস যেমন– প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যাডেনো, আরএসভি, মেটানিউমোনিয়া ভাইরাস কাছাকাছি উপসর্গ নিয়ে প্রকাশ পেলেও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসঘটিত ফ্লু নিয়ে বেশি আলোচনা হয়ে থাকে। প্রতিবছর বিশ্বের শতকরা ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এটি সাদামাটা মনে হলেও অনেক সময় ভয়ানক আকার ধারণ করতে পারে। বছরে পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ৬ লাখের অধিক মানুষ এতে মৃত্যুবরণ করে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস প্রতিকূল পরিবেশে দ্রুত নিজেকে বদলে ফেলতে সক্ষম। এ কারণেই প্রতিবছর ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক টিকা নতুন করে তৈরি করতে হয়। অর্থাৎ বিগত বছরের ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা কিন্তু এ বছরের জন্য মোটেও কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ছয় মাস বয়স থেকে শুরু করে সবার জন্য প্রতিবছর এই টিকা নেওয়া দরকার। এটি যাদের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তারা হলো– ৬ মাস থেকে ৬ বয়স বছর বয়সী শিশু, পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি, গর্ভবতী মা, কিডনি ফেইলিউর, হৃদরোগ, অ্যাজমা কিংবা ক্রনিক অবস্ট্রাকাটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) আক্রান্ত ব্যক্তি। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদেরও প্রতিবছর এ টিকা নিতে হবে। এ ছাড়া যারা বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন, ওমরাহ পালন করার জন্য যাচ্ছেন তাদের জন্য টিকা দেওয়াটা জরুরি।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ এই টিকা নেওয়ার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, সবাইকে জানাতে হবে এই টিকার গুরুত্ব। তবে কারা টিকা দিতে পারবে আর কারা পারবে না, সেটাও জেনে নিতে হবে। ফ্লুয়ের টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মেডিসিন স্পেশালিস্ট লে. কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ টিকা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, এটি দেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রাচীর তৈরি হয়ে যায় এবং ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত এর স্থায়িত্বকাল থাকে। কোনো টিকাই ১০০ শতাংশ কার্যকর নয়। টিকা দেওয়ার কারণে ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। তীব্র ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়। এর কারণে হাসপাতালে ভর্তির মাত্রা অনেক কমে যায়।

তাছাড়া কিছু রোগব্যাধি যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগের তীব্রতা অনেকটা কমে যায়। সারা বছর ফ্লু দেখা গেলেও শীতের শুরুর দিকে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, নাকের পানি বা প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। শরীরে জীবাণু প্রবেশের ১২-৭২ ঘণ্টা পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। হঠাৎ করে তীব্র জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, শীত অনুভব, মাথাব্যথা, গা ম্যাজম্যাজ, খাওয়ায় অনীহা নিয়ে ফ্লু দেখা দেয়। নাক দিয়ে পানি, কাশি, গলা ব্যথা, পেট ব্যথা, বমি, ডায়রিয়ার কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় এই ভাইরাস নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, ক্রুপ (ঘড়ঘড়ে কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট), মধ্যকর্ণে সংক্রমণ, মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা সহকারে অবশ ভাব, গিয়েন বারে সিনড্রোমের মতো জটিলতা করতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে যেসব শিশুদের আগে থেকে হৃৎপিণ্ড, কিডনি, লিভার, ফুসফুসের সমস্যা আছে, হাঁপানি, সিসটিক ফাইব্রোসিস আছে অথবা যারা কেমোথেরাপি বা এমন ওষুধ নিচ্ছে, যা নিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। কারা এই টিকা নিতে পারবে না তা জানান আইসিএমএইচের চিকিৎসক আহাদ আদনান।

ছয় মাসের কম বয়স যাদের, এবং অতীতে যাদের টিকা বা অন্য কোনো অ্যালার্জির ইতিহাস আছে (ডিমে অ্যালার্জি বাদে), একই সঙ্গে যাদের গিয়েন বারে সিনড্রোম নামের এক ধরনের প্যারালাইসিস রোগের ইতিহাস আছে।  টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে এই বিষয়ে  ডা. নাসির উদ্দিন বলেন, টিকা দিলে সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেমন হালকা জ্বর, গা ব্যথা, টিকার স্থানে ব্যথা ইত্যাদি। কারও কারও টিকাতে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। তীব্র মাত্রায় অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হলে তাদের টিকা না নেওয়া ভালো। বিরল ক্ষেত্রে গুলেন বারি সিনড্রোম নামে একটি স্নায়বিক রোগ হতে পারে। আমাদের দেশেই উৎপাদিত ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা টিকা পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির  উৎপাদিত কোম্পানির টিকাও রয়েছে বাজারে। দেশে দেশেই উৎপাদিত টিকার মূল্য ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। টিকার জন্য বছরে একটি ডোজই যথেষ্ট। কারও কারও ক্ষেত্রে দুই ডোজ টিকা দেওয়া প্রয়োজন পড়তে পারে। টিকা দেওয়া হয় মাংসপেশিতে। এটি দিতে হবে প্রতিবছর ফ্লুর প্রাদুর্ভাব শুরুর আগেই। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস, মাস্কের ব্যবহার, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

আরও পড়ুন

×