ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সড়ক নিরাপত্তায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

সিআইপিআরবি-সমকাল গোলটেবিল বৈঠক

সড়ক নিরাপত্তায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সমকাল কার্যালয়ে গতকাল বুধবার ‘সড়ক নিরাপত্তা : বর্তমান প্রেক্ষিত, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিলে অতিথিরা সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় কতজন নিহত ও আহত হন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সড়কে একটি মৃত্যু তার পরিবারকে দুঃসহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে নিতে হবে সমন্বিত পদক্ষেপ; প্রণয়ন করতে হবে একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী সড়ক নিরাপত্তা আইন। সেই আইনের সঠিক বাস্তবায়নের উদ্যোগও নিতে হবে। ‘সড়ক নিরাপত্তা বর্তমান প্রেক্ষিত, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শিরোনামে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ের সভাকক্ষে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) ও সমকাল যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল গ্লোবাল রোড সেফটি পার্টনারশিপ ও রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিআইপিআরবির উপনির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা। অধিকাংশ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে জিডিপির ১ থেকে ৩ শতাংশ সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়। অন্যদিকে, ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার বিষয়ে জাতিসংঘের যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অগ্রগতিও অত্যন্ত নগণ্য।

শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সিআইপিআরবির নির্বাহী উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এ কে এম ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তা কেবল একটি পরিবহন নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মানবাধিকারের বিষয়ও। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সঠিক সংখ্যা না জানলেও একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হলে তার পরিবারে কত দুঃসহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেটা আমরা জানি। তাই সবাই মিলে সচেষ্ট থাকলে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাতে পারব, সড়ক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’ 

অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। 

প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত, দুর্ঘটনা কমানো এবং যানজটমুক্ত রাখতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর চারটি বাস টার্মিনাল নগরীর বাইরে স্থানান্তর করে সেখানে নগর বাসস্ট্যান্ড স্থাপন করা হবে। ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নে বুয়েট ও সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় এআই প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। ইটিসি ব্যবস্থার মাধ্যমে মহাসড়কে টোল আদায় এবং আইন করে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িগুলো ডাম্পিংয়ের বদলে স্ক্রাপের লক্ষ্যে মেশিন আনা হচ্ছে। 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মহাসড়কগুলোতে অটোমেটিক সিস্টেম ব্যবহার করে অতিরিক্ত পণ্য বহনে (ওভারলোডিং) জরিমানা আদায়, রেল ক্রসিংগুলোতে আন্ডারপাস নির্মাণ, সড়ক-মহাসড়কে আউটার সার্কুলার ও ইনার সার্কুলার রোড চিহ্নিত করে সমন্বয় এবং সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নিহত-আহতদের ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিশোধের পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকার যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘ বিতর্ক শেষে আমরা এই আইন বিষয়ে একমত হয়েছি। মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে থাকা দ্বিমতও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা হয়েছে। তবে এর সঙ্গে অনেক মন্ত্রণালয় যুক্ত। সবার সঙ্গে সমন্বয় করে এক দিন আগেও যদি আমরা এই আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে অন্তত একটি জীবন হলেও আমরা রক্ষা করতে পারব।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, দেশে প্রতিবছর কতটি সড়ক দুর্ঘটনায় কতজন নিহত ও আহত হন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সড়ক নির্মাণ ও যানবাহনে ত্রুটি না থাকলে এবং চালক ও মানুষ সচেতন হলে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। 

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে মহাসড়কে পুলিশ ও মালিক সমিতির চাঁদাবাজি বন্ধ এবং মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (হাইওয়ে) ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, আমরা আলোচনার পর আলোচনা করে যাই। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা কমে না। আরও বেড়ে যায়। কারণ আলোচনায় যেসব সংকট চিহ্নিত করা হয় এবং সুপারিশ করা হয়, সেগুলোর সমাধান হয় না। 

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটার বড় কারণ অপ্রশিক্ষিত গাড়িচালক। প্রশিক্ষিত গাড়িচালক তৈরি করতে না পারলে কোনো লাভ হবে না। অনেক সময় চালকের সহকারী গাড়ি চালান। এদের প্রশিক্ষণ নেই। জ্ঞানও নেই। এরা অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটায়। পুলিশের দায়িত্ব অনেকটা গোলরক্ষকের মতো। মাঠে অন্য খেলোয়াড়রা যদি ভালো করেন, তাহলে গোলরক্ষক বা পুলিশের দরকার পড়বে না।  

ফারুক আহমেদ আরও বলেন, এখানে কারও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নেই। যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে সমস্যা থাকবে না। পাঁচ হাজার ট্রাফিক পুলিশ সড়কে দায়িত্ব পালন করেন। যেদিন এই সংখ্যা পাঁচশতে নামিয়ে আনতে পারব, সেদিন যানজট কমে যাবে। তাই যানজট কমাতে মানুষ কমাতে হবে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সমাজে ভালো কাজ হলে পুলিশের প্রয়োজন হবে না।  

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সড়ক দুর্ঘটনা মোকাবিলায় নানা সুপারিশ তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের নীতিতে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। এটা ঠিক করতে পারলে দুর্ঘটনা কমবে, সড়ক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। এটা একটা সমন্বিত উদ্যোগ। সবাই মিলে কাজ করে একটি জীবনও যদি বাঁচাতে পারি, সেটাই অনেক বড় ব্যাপার হবে।’  

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট সৃষ্টির কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইনে নির্মিত মহাসড়কের পাশে ও মাঝে বাজারের অবস্থান; অবৈধ গাড়ি পার্কিং; চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বিশ্রামের অভাব; মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি ডাম্পিং নীতিমালা না থাকা; লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশা চলাচল ও গণপরিবহনের আধিক্য; সড়কের অপর্যাপ্ততা; ওভারপাসের প্রবেশপথে টোল আদায় ইত্যাদিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান না হলে উন্নয়নের সুফল কেউই পাবে না। বরং আগের উন্নয়ন বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।        

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রকল্পের (বিআরএসপি) প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাব্বির হাসান খান বলেন, একটি দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। এ জন্য হতাশ হলে চলবে না। একে অপরকে দায়ী করেও পার পাওয়া যাবে না। এটি একটি সমন্বিত ইস্যু। সমন্বিতভাবেই এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ অফিসের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার খন্দকার মো. ওয়াতিন আলম বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তায় অনেক অনেক সংস্থা কাজ করলেও লিড এজেন্সি কে– সেটাই আমরা জানি না। নেতৃত্বের ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতির উত্তরণও ঘটছে না। তাই সরকারকেই একটা লিড এজেন্সি ঠিক করে দিতে হবে। যার মাধ্যমে একটা সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, সড়ক নিরাপদ করতে হলে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক প্রতিরোধ ও সরকারের দৃঢ়তা। দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে।

গ্লোবাল হেল্থ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ড. মো. শরিফুল আলম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সব থেকে বেশি কর্মক্ষম যুবশক্তি মারা যায়। কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে এই যুবশক্তির মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে হবে।

ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার খালিদ মাহমুদ বলেন, রাস্তার কাঠামো এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন গাড়িগুলো চাইলেও ইউটার্ন ও ওভারটেকিং করতে না পারে। রাস্তায় চলাচলের নিয়ম-কানুনে মানুষ ভুল করবেই। সেই ভুলগুলো যেন মানুষের মৃত্যু বা আহত হওয়ার কারণ না হতে পারে।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তায় আমাদের নীতি আছে। সেই নীতি অনুযায়ী কাজ হওয়া দরকার।’

ব্র্যাকের প্রশাসন ও সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন বলেন, সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করার জন্য লিড এজেন্সির পাশাপাশি কঠোর আইনেরও প্রয়োজন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ড. কামরান উল বাসেত সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তথ্যগত ত্রুটি ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা সমস্যাগুলো ও এর সমাধানও জানি। কিন্তু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া জানি না। সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। সরকারি পর্যায় থেকেই সমন্বয় থাকতে হবে।’

নিরাপদ সড়ক চাই-এর মহাসচিব লিটন এরশাদ বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। 
বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক হলেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাব্বির হাসান খান।
সিআইপিআরবির পরিচালক (প্রশাসন) কর্নেল মো. ইমরান উল্লাহ সরকার (অব.) ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। 

 

আরও পড়ুন

×