ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে চাই সমন্বিত পদক্ষেপ

সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে চাই সমন্বিত পদক্ষেপ
×

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) ও সমকাল আয়োজিত ‘সড়ক নিরাপত্তা বর্তমান প্রেক্ষিত, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কতজন নিহত ও আহত হন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল ঠেকানোর লক্ষ্যে ‘সড়ক নিরাপত্তা বর্তমান প্রেক্ষিত, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শিরোনামে ২৯ জুলাই সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত হয় গোলটেবিল বৈঠক। এ বৈঠকের যৌথ আয়োজক সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) ও সমকাল। সহযোগিতায় ছিল গ্লোবাল রোড সেফটি পার্টনারশিপ এবং রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ।

হাবিবুর রশিদ 
প্রতিমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় 

বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। সুতরাং এই সরকারের জনগণের কাছে জবাবদিহি আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রতিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গীরকারবদ্ধ। তিনিও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছেন। প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। 

আমরা ঢাকা শহরকে যানজটমুক্ত করতে কাজ করছি। চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান টার্মিনালগুলোতে সিটি বাসস্ট্যান্ড স্থাপন করা হবে। ট্র্যাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নে বুয়েট ও সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। মহাসড়কে টোল আদায়ের কারণে সমস্যা হয়। ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থার মাধ্যমে এই টোল আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিআরটিএকেও এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডাম্পিংয়ের সুযোগ নিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তায় চলাচল করে। আইন প্রণয়ন করে মেশিন আনা হচ্ছে, যাতে ডাম্পিং না করে এগুলোকে স্ক্র্যাপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। 

মহাসড়কগুলোতে অটোম্যাটিক সিস্টেম প্রবর্তন করে ওভারলোডিংয়ের (অতিরিক্ত পণ্য বহন) জন্য জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। রেলক্রসিংগুলোতে আন্ডারপাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক-মহাসড়কে আউটার সার্কুলার ও ইনার সার্কুলার রোড চিহ্নিত করে সমন্বয় করা হচ্ছে।

প্রতিটি জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। আমরা কোনো দুর্ঘটনা চাই না। কিন্তু দুর্ঘটনা সারাবিশ্বে ঘটছে, বাংলাদেশেও ঘটছে। সেক্ষেত্রে আমরা দুর্ঘটনার সংখ্যা কমিয়ে আনতে চাই। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণের অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দিতে সমন্বিতভাবে কাজ করছি। 
কেবল পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, সরকারের কেবল পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়েছে। আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। আবার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে যে দাতা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নিতে হয়, তাদেরও নানা চিন্তা-ভাবনা থাকে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি– প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ঋণ নেব না। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে যারা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চাইবে, তাদের কাছ থেকেই সহযোগিতা নেওয়া হবে।
এই সরকার কোনো কিছু ঘটার পর সমাধানের চিন্তা করছে না। ঘটার আগেই মানুষের জীবন রক্ষার জন্য চেষ্টা করছে। মানুষের সুষ্ঠু জীবনযাপন নিশ্চিত করতে এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি।    

শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী 
সচিব, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ

সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ নাকি ‌‘ক্র্যাশ’ বলা হবে, সেটি নিয়ে আমাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। পরে এটিকে ‘ক্র্যাশ’ বলাটাই যুক্তিযুক্ত হবে বলে আমরা একমত হয়েছি। একইসঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা আইন নিয়েও দীর্ঘ বিতর্ক শেষে আমরা এই আইন বিষয়েও একমত হয়েছি। যদিও মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে এ নিয়ে কিছুটা দ্বিমতও ছিল। পরে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিকদের মধ্যে শংকা ছিল, এটাতে যে শাস্তির বিধান করা হচ্ছে, তাতে নতুন করে কোনো সমস্যা হবে কিনা। পরে তাদের সঙ্গে আলোচনার পর এটিতেও আমরা একমত হয়েছি। 
তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, শাস্তির চেয়ে নিরাপত্তা জরুরি। তবে  সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর করতে পারলে আমরা একটি সমাধান পাব। আমরা সম্প্রতি দেখলাম যে একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দুর্ঘটনায় খবর শুনে উদ্ধার কার্যক্রমে গিয়ে দেখলেন, তাঁর নিজের সন্তানই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এটি যে কতটা বেদনাদায়ক, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একদিন আগেও যদি আমরা এই আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে অন্তত একটি জীবন হলেও আমরা রক্ষা করতে পারব।    

ফারুক আহমেদ
অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (হাইওয়ে), বাংলাদেশ পুলিশ

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেসব সংকট চিহ্নিত করা হয় এবং সুপারিশ করা হয়, সেগুলোর সমাধান হয় না। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ চালক, রাস্তা ও ইউটার্ন। প্রশিক্ষিত গাড়িচালক তৈরি করতে না পারলে কোনো লাভ হবে না। অনেক সময় চালকের সহকারী গাড়ি চালান। তাদের প্রশিক্ষণ নেই, জ্ঞানও নেই। সড়ক ব্যবস্থাপনা এমন হতে হবে যে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশকে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে না।  সড়কে গাড়িগুলোকে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। গাড়িগুলো মোড় ঘোরার সময় যেন মুখোমুখি না হয়। পাঁচ হাজার ট্রাফিক পুলিশ সড়কে দায়িত্ব পালন করেন। যেদিন এই সংখ্যা পাঁচশতে নামিয়ে আনতে পারব, সেদিন যানজট কমে যাবে। যানজট কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। 
দলের অন্য খেলোয়াড়রা ভালো খেললে, গোলরক্ষকের কাছে খুব একটা বল যায় না। সড়ক ব্যবস্থাপনায় পুলিশ হচ্ছে গোলরক্ষক। গাড়ির যদি ফিটনেস থাকে, চালক যদি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হয়, রাস্তা ব্যবস্থাপনা যদি সঠিক থাকে তবে ট্রাফিক পুলিশকে মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। আমরা মহাসড়কে পুলিশ ও মালিক সমিতির চাঁদাবাজি বন্ধ করব। যানজটমুক্ত করব। এজন্য সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
 

মো. আনিসুর রহমান
অতিরিক্ত সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ    

সড়ক নিরাপত্তায় যে আইন হচ্ছে, সেখানে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের সবটাই আছে। সব অংশীজনকে নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা করে এই আইনের খসড়া করা হয়েছে। খসড়ায় সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালক, পুলিশ বা মালিক–যেই দায়ী হোন না কেন সবার জন্যই কঠোর শাস্তির জন্য সুপারিশ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আশা করছি, এই আইন দ্রুত পাস করা হবে। বর্তমানে হেলমেট ও অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালা নিয়েও কাজ চলছে। আমাদের স্ট্যাবলিস্ট পলিসিতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। এটি ঠিক করতে পারলে দুর্ঘটনা কমবে, সড়ক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। এই আইনের আওতায় রাস্তায় চলাচল করা লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িও পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। সড়ক মন্ত্রণালয়ে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে আলাদা সেল করা হয়েছে। এগুলোতে নিয়মিত মিটিং ও সমন্বয় করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারলে, সমাধান বের হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোও সক্রিয় করা উচিত। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা যে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ গুণ বেশি মৃত্যুর কথা বলছে, সেটি অথেনটিক নয়। এটি নিয়েও সঠিক গবেষণা হওয়া উচিত প্রকৃত সংখ্যাটা যেন বেরিয়ে আসে। মন্ত্রণালয় পলিসি নিয়ে কাজ করছে। এটি একটা সমন্বিত উদ্যোগ।  সেটি করা গেলে এর সুফল নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের প্রকৃত ডেটা নিয়েও কাজ করা দরকার।  

অধ্যাপক ড. একেএম ফজলুর রহমান 
নির্বাহী উপদেষ্টা, সিআইপিআরবি 

সড়ক নিরাপত্তা শুধু পরিবহন নিরাপত্তা বিষয় নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মানবাধিকারের বিষয়ও। সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতি বছর কতজন নিহত ও আহত হয়–তার সঠিক  পরিসংখ্যান আমরা জানি না। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হলে কিংবা কেউ আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে গেলে সেই পরিবারটি কতটা দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়ে সেটি আমরা জানি। অপরদিকে সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতিও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাবে ফেলে। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এটি একটি সামাজিক ও মানবিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আশা করি, এই গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত সরকারের প্রতিনিধিসহ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করা দেশের নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ করেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এর সফল বাস্তবায়ন কঠিন। আমরা সবাই মিলে যদি সচেষ্ট থাকি, যার যার অবস্থান থেকে যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করি তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

আনিছুর রহমান 
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক), ডিএমপি 

আমাদের মহাসড়কগুলোর গায়ে গায়ে বাজার। অথচ মহাসড়কের দুই কিলোমিটার দূরে বাজার থাকার কথা। দুর্ঘটনা এড়াতে বাজারগুলো বাইরে সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। অবৈধ গাড়ি পার্কিংও যানজট বাড়াচ্ছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের দুই পাশে প্রতিদিন প্রায় সাতশ গাড়ি পার্ক করা হয়। গুলিস্তান সিনেমা হলের নিচের রাস্তায় ডাবল পার্কিং আছে। মহাসড়কের চালকদের বিশ্রামের জায়গা নেই। তারা অনেক সময় ২৪ ঘণ্টা টানা গাড়ি চালান। মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি ডাম্পিং নীতিমালা ও ডাম্পিং গ্রাউন্ড নেই। ঢাকা মহানগরীতে রাস্তায় তিন শিফটে ৩৬০০ পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। এক শিফটে ১২০০ পুলিশ রয়েছেন। ১২০০ জনবল দিয়ে দেড় কোটি মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে দেওয়া সম্ভব? রাজধানী ঢাকায় লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশায় ভরে গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও বেড়েছে। সিঙ্গাপুরে যেখানে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা ও লাইসেন্স পাওয়া বিরাট ব্যাপার, আমাদের দেশে সেখানে রাস্তায় গাড়ি নামছে তো নামছেই। যেখানে ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা দরকার, সেখানে কাগজে কলমে আছে ৮ শতাংশ। বাস্তবে আছে ৬ শতাংশ। ওভারপাসগুলোর প্রবেশপথে টোল আদায় করায় নিচে বহু গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। এতে যানজট বাড়ে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে উন্নয়নের সুফল কেউই পাবে না। 

মোহাম্মদ সাব্বির হাসান খান
প্রকল্প পরিচালক, বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রকল্প (বিআরএসপি) ও 
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেক কারণ দায়ী থাকে। কোনো সেক্টরকে এককভাবে কিংবা একে অপরকে দায়ী করেও পার পাওয়া যাবে না। উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ সড়কেও দুর্ঘটনা ঘটে। এটি একটি সমন্বিত ইস্যু। সমন্বিতভাবেই এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। সরকার সেফ সিস্টেম ডেভেলপ করছে। একে অনুসরণ করে কাজ করতে হবে। 
সবকিছুর ওপর মানুষ সচেতন না হলে দুর্ঘটনা ঘটবেই। অনেক সময় মানুষ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে ট্রাফিক সিগন্যাল ও রাস্তায় চলাচলের নিয়ম-কানুন দেওয়া আছে। সেটিকে আরও সম্প্রসারিত করা দরকার।  আমাদের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ও নিহত-আহতের সংখ্যা নিয়ে সমন্বিত ডেটাবেইজ নেই। আগামী বছরের মধ্যে একটা ডেটাবেজ গড়ে তোলা হবে। এটি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশের চাহিদা অনুযায়ী করা হবে। সকল অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা করে এগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। হতাশার মধ্যেও আশার আলো দেখতেই হবে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। আশা করি, সবাই মিলে কাজ করে এই সমস্যা আমরা ওভারকাম করতে পারবো।     

 

ডা. মো. নুরুল ইসলাম 
পরিচালক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

দেশে মোট মৃত্যুর ৮ শতাংশই হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। পাশাপাশি বহু মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে সরকারের রোড সেফটি প্রকল্প কাজ করছে। এতে চারটি সংস্থা সম্পৃক্ত রয়েছে। এর মধ্যে একটি  স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। আমরা এখানে ‘পোস্ট ক্র্যাশ রেসপন্স’ নিয়ে কাজ করছি। স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ হচ্ছে–সড়ক দুর্ঘটনার পরপরই আহতদের দ্রুত  উদ্ধার এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। দুর্ঘটনার পরের এক ঘণ্টা হচ্ছে ‘গোল্ডেন আওয়ার’। এই সময়ের মধ্যে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব। এটি করতে প্রাথমিকভাবে জয়দেবপুর হয়ে রংপুর ও রাজশাহী পর্যন্ত ৫০০ কিলোমিটার মহাসড়ককে করিডোর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই করিডোরে ১০ কিলোমিটার অন্তর প্রাথমিক লাইফ সাপোর্ট দিতে সক্ষম একটি করে অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। আমাদের একটি বিশেষ নাম্বার থাকবে; যেখানে কল করে দুর্ঘটনার খবর জানানো যাবে। আমরা সংবাদ প্রাপ্তির ১০ মিনিটের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হব। এই প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি হাসপাতালকে দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা আছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে অনেক আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। 

 ড. সেলিম মাহমুদ চৌধুরী
উপ-নির্বাহী পরিচালক, সিআইপিআরবি (মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন)

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দুর্ঘটনায় আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা। অধিকাংশ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে জিডিপির ১ থেকে ৩ শতাংশ সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়। 
গত এক দশকে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সক্ষম হলেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ঠিক উল্টো। পরিসংখ্যানে বলছে, দেশে ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দুর্ঘটনা ও জিডিপির ক্ষতি ১ শতাংশ বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রগতি সামান্য।
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুকিঁপূর্ণ আচরণ বদলাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। চালকদের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা পারাপারে নিয়ম পরিপালনে জোর দিতে হবে। অনেক সময় রাস্তা পারাপারে নিয়ম মানি না, ফোনে কথা  বলতে বলতে রাস্তা পার হই। এতে দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের দোষ হয়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় রাজধানীতে স্বল্প পরিসরে এআই সিস্টেম চালু করা হয়েছে। এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। পুরো সড়ক পরিবহন খাতকে প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে। 

 

অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান 
পরিচালক, অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই), বুয়েট 

সড়ক নিরাপত্তায় আমাদের নীতিমালা আছে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী কাজ হওয়া দরকার। এখানে সড়ক দুর্ঘটনার ডেটা দেওয়া হলো। দেখা যাচ্ছে–সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছেই। তার মানে নীতিমালা কাজ করছে না। কেন কাজ করছে না–এটা নিয়ে গবেষণা জরুরি। পৃথিবীর কোথায় অ্যাম্বুলেন্স উল্টো পথে চলে না। অন্য গাড়ি বাদ দিলাম। শান্তিনগরের রাস্তা ওয়ান ওয়ে করা হয়েছে। পুলিশের গাড়ি সব উল্টো পথে চলে। ফুটপাত থাকলেও দখল হয়ে আছে। সাধারণ মানুষ ফুটপাতে হাঁটতে পারে না। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে। দেশে আইন আছে, কিন্তু অমান্য করলে শাস্তি নাই। আইন অমান্যকারীদের জন্য সবক্ষেত্রে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।  বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। অর্থ খরচ হচ্ছে। রোগ সারছে না। অনেকে সমন্বয়ের অভাবের কথা বললেন। সেই সমন্বয় কীভাবে করা যায়, সেটি নিয়েও কাজ করা দরকার। পাশাপাশি মানুষকে সচেতনও করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়লে এই সংকট অনেকটাই কমে আসবে।   

 

আহমেদ নাজমুল হুসেইন 
পরিচালক, প্রশাসন ও সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ব্র্যাক 

সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করার জন্য দুটি বিষয় প্রয়োজন– মূল সংস্থা এবং কঠোর আইন। সড়ক নিরাপত্তার কাজগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা ও তদারকি করতে  শক্তিশালী লিড এজেন্সি থাকা জরুরি। কঠোর আইন তো করতেই হবে, পাশাপাশি সেটির প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে কাজ করতে পারলে জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার যে অঙ্গীকার রয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন সহজ হবে।      
সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর পর ব্র্যাক একটি আন্তর্জাতিকমানের চালক প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। যেখানে ইউরোপের মানের সিলেবাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ৩৫ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী চালকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। ব্র্যাকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পেয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার প্রশিক্ষিত নারী চালক দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছেন।  

 

মো. সাইফুল আলম 
মহাসচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি 

নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে সড়ককে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য সরকারকে নিরাপদ ব্যবহার উপযোগী সড়ক নির্মাণ করতে হবে। দুর্ঘটনায় কতজন মারা গেল, আমরা তার হিসাব করি। কিন্তু যারা আহত বা পঙ্গু হয়, তাদের পরিবার ও জীবন কীভাবে চলে, সেটি দেখি না। সেটিও ভাবতে হবে। সড়ককে নিরাপদ করতে সড়কের কাঠামোগত ত্রুটি ঠিক করতে হবে। মহাসড়ক, সড়ক বা উপসড়কে কী ধরনের যানবাহন চলতে পারবে, তার শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে। মহাসড়কে ৩০ কিলোমিটার বেগের লাইসেন্সবিহীন ভটভটি, নছিমন ও করিমন চলে। এগুলো মহাসড়কে চলতে গিয়ে হঠাৎ করে ঘুরিয়ে দেয়। তখন হার্ড ব্রেক করেও ৭০-৮০ কিলোমিটার বেগে চলা গাড়িগুলোকে থামানো যায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটে। কাজেই মহাসড়কে ভটভটি, নছিমন ও করিমন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সড়ককে নিরাপদ করার চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে– রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক প্রতিরোধ ও সরকারের দৃঢ়তা। দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে। 

 

ড. মো. শরিফুল আলম
কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, গ্লোবাল হেল্থ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)
 
কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে হবে। ২০১৮ সালের সড়ক আইন আছে। এটি সড়ক নিরাপত্তার আইন নয়, যানবাহন নিরাপত্তার আইন। সরকার এখন সড়ক নিরাপত্তা আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই আইনকে বাস্তবিক অর্থে সড়ক নিরাপত্তা আইন হিসেবে করতে হবে। সেটিকে বাস্তবায়নও করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে মূল সংস্থা নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা আলোচনায় এসেছে। এই সংস্থার আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে। আর সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের যে সংস্থাগুলো কাজ করে, সেগুলোর অনেকেরই নিজস্ব অর্থ নাই, জনবলও নাই। অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। জনবলও বাড়াতে হবে; যাতে তারা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে। দেশের ৭০ ভাগ রাস্তাই ত্রুটিপূর্ণ। এগুলো ঠিক নেই, রাস্তার বাঁকগুলোও ঠিক নেই। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এখন রাস্তা করতে হয় নিরাপত্তার জন্য। রাস্তাই যদি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে লাভ হলো কী? 
 

 

খালিদ মাহমুদ 
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রোড সেফটি প্রোগ্রাম, ব্র‍্যাক  

সরকারি হিসাবেই দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৭ জন মারা যান। অর্থাৎ প্রতি তিন দিনে একটি বাসের মোট যাত্রীর সমান মানুষ মারা যাচ্ছেন। সড়ক নিরাপত্তার জন্য মূলত তিনটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে–রাস্তার নিরাপদ অবকাঠামো, যানবাহন সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রশিক্ষণ। রাস্তাগুলো এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন গাড়িগুলো চাইলেও ইউটার্ন ও গতি বাড়াতে না পারে। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পোস্ট ক্র্যাশ রেসপন্স ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়ন করতে হবে।  
এখানে কে ভুল করল, সেটি বিষয় নয়। ভুলের কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলো কিনা সেটিই দেখার বিষয়। নিয়মিত মিটিং করে কার্যপন্থা ঠিক করতে হবে। সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। 
নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনে জনসচেতনতার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক সময় মানুষ রাস্তায় চলাচলের নিয়মকানুন সঠিকভাবে না মানায় দুর্ঘটনা হয়। এক্ষেত্রে সচেতনতা জরুরি।  তবে মানুষ তো ভুল করবেই। সেই ভুলগুলো যেন দুর্ঘটনার কারণ না হয়, সেদিকে নজর দিতে হয়।   

 

ড. খন্দকার মো. ওয়াতিন আলম
ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ অফিস 

সড়ককে নিরাপদ করার জন্য আমরা এখনও একটা কাঠামো দাঁড় করাতে পারিনি। আমাদের এখানে নেতৃত্বের ঘাটতি আছে। ফলে আমরা পরিস্থিতির উত্তরণও ঘটাতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ঠিক করতে হবে মূল ভূমিকায় কে থাকবে; যাতে তাদের নেতৃত্বে অন্য সংস্থাগুলো কাজ করতে পারে। ২০১৭ সালের বিআরটিএর আইন অনুযায়ী, একটা উপদেষ্টা পরিষদ রয়েছে। সেটির কার্যক্রম নেই। এই উপদেষ্টা পরিষদকে কার্যকর করে তাদের নেতৃত্ব দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মূলত দুর্ঘটনা-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করে। দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে কত দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করে। এ-সংক্রান্ত আমাদের একটি প্রকল্পও আছে। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। তাই সরকারকে বলব, একটা লিড এজেন্সি ঠিক করে দিন; যার মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়।

 

ড. কামরান উল বাসেত
ভাইস চেয়ারম্যান, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন  

আমাদের সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তথ্যগত অসংগতি রয়েছে। সংকটটা যদি ধরতেই না পারি, তাহলে সেটি মোকাবিলা করব কীভাবে? আমরা বড় মৃত্যুগুলো নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। ছোট মৃত্যুগুলো নিয়ে চিন্তাই করছি না। 
আমরা সমস্যাগুলো ও এর সমাধান জানি। বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া জানি না। সমন্বয়ের ঘাটতিও রয়েছে। আমরা সড়ক নিরাপত্তা আইন করতে যাচ্ছি। সেখানেও অনেক অসংগতি আছে। মোট কথা আমাদের অনেক কিছু আছে। কিন্তু সমন্বয়ের জায়গায় ত্রুটি আছে। এই তথ্যগত ঘাটতি পূরণ এবং সমন্বয়ের ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে। 
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারেরও সতর্ক থাকা উচিত, সচেতন থাকা উচিত। গত ৫০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য জিডিপির ক্ষতি নিয়ে গবেষণা হয়নি। সমস্যা সম্পর্কে জানতে না পারলে সমাধান হবে কীভাবে–এক্ষেত্রে একটা সঠিক গবেষণা থাকাও জরুরি

 

লিটন এরশাদ
মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই 

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে  আমাদের অর্থ, পরিকল্পনা, প্রকল্প, সবই আছে। কিন্তু কোথাও একটা ঘাটতি রয়েছে। সেটি হচ্ছে–রাজনৈতিক সদিচ্ছা । এই জায়গা জাতীয়ভাবে ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়েছে। ঢাকা থেকে তিনটি বাস টার্মিনাল সরিয়ে নিতে সরকার সফল হয়েছে। 
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআইভিত্তিক ক্যামেরা যেখানে আছে, সেখানে কিন্তু চালকরা অনেক সচেতন থাকে। মানুষ কিন্তু ভুল করবে। ভুল কোথায় হচ্ছে–এটা চিহ্নিত করতে হবে। সেটি করতে পারলে জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, সেটি আরও আগেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।     

 

কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার, পিবিজিএম, পিবিজিএমএস (অব.) 
পরিচালক– মানবসম্পদ ও প্রশাসন, সিআইপিআরবি

সড়ক নিরাপত্তা নীতিমালা ও বিধি প্রণয়ন, সংস্কার, বাস্তবায়ন, প্রশাসন, নিয়ন্ত্রণ, ব‍্যবস্থাপনা, পরিচালন, গবেষণাসংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান; যার যার অবস্থান থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি কোনো একক সংস্থার পক্ষে একা কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন এ কাজে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে এক ছাতার নিচে এনে সমন্বিতভাবে কাজ করা। প্রয়োজন এই সংক্রান্ত একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো; যারা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ এবং অংশীজনের কার্যক্রমের সমন্বয় বিধান করে এর কার্যকরী বাস্তবায়ন করবে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকল মহলের পক্ষ থেকে জনগণের জন্য সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গৃহীত সকল কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। যথাযথ সমন্বয় ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই এই উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

 

সুপারিশ

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি পৃথক সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্বে মূল সংস্থা নির্ধারণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে।
যত্রতত্র রাস্তা পারাপার রোধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
মহাসড়কে নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ ধীরগতির ছোট বাহন চলাচল বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআইসহ প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়াতে হবে।
দক্ষ চালকের সংখ্যা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। চালকের শ্রমঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
 

গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। সমন্বয়ে ছিলেন সমকালের হেড অব ইভেন্টস হাসান জাকির ও সিআইপিআরবির প্রোগ্রাম ম্যানেজার 
(রোড সেফটি) কাজী বোরহান উদ্দিন।

আরও পড়ুন

×