গোলটেবিল বৈঠক
সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শতভাগ অটোমেশন জরুরি
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস মিডিয়া ভবনের সমকাল কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার ‘সরকারি ক্রয় : স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা - সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় (ই-জিপি) ব্যবস্থা অনলাইনে ও উন্মুক্ত হলেও টেন্ডার কারসাজির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুরো সিস্টেমটিকে শতভাগ ডিজিটাল করা প্রয়োজন। কর্মকর্তারা সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে দরপত্র মূল্যায়ন আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে। গতকাল মঙ্গলবার সমকাল আয়োজিত ‘সরকারি ক্রয়: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সভাকক্ষে আয়োজিত বৈঠকে সহযোগী ছিল আর্টকম।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোর কার্যকর প্রয়োগ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ জরুরি।
তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থ সরকারি ক্রয়ে ব্যয় হয়। বর্তমানে শতভাগ সরকারি দরপত্র অনলাইনে প্রকাশ হচ্ছে। বর্তমানে দৈনিক ই-জিপি নিবন্ধন আবেদন ২০০-৩০০টিতে উন্নীত হয়েছে। সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে দরপত্র মূল্যায়নে প্রকাশিত মানদণ্ড অনুসরণ, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি ক্রয় কাজের মান ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। এ জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে ক্রয়কাজে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, ঠিকাদারসহ অংশীজনকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
তিনি বলেন, নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং নতুন প্রতিষ্ঠান থেকে কেনাকাটার জন্য পরিচালন বাজেটের ন্যূনতম ২৫ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে ছোট কোম্পানিও কাজের সুযোগ পাবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসন এবং ঠিকাদারের যোগসাজশে ত্রিপক্ষীয় আঁতাতে সিন্ডিকেট তৈরি হয়। আগেই ঠিক হয়ে যায়, কাকে কাজ দেওয়া হবে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কেবল একক ঠিকাদার অংশ নিয়েছিলেন– এমন দরপত্রের মাধ্যমে বিগত ১১ বছরে ৬০ হাজার ৬৯ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। ই-জিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব দরপত্রের প্রতিটিতে একজন ঠিকাদার অংশ নিয়েছিলেন এবং সেই ঠিকাদারই কাজ পেয়েছিলেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ই-জিপির কার্যকর সুফল পেতে ই-জিপিকে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করা, সব ধরনের ক্রয় ই-জিপির মাধ্যমে করা, প্রাক-দরপত্র মিটিং নিশ্চিত করা, ঠিকাদারদের অনলাইন ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের বলেন, দরপত্র মূল্যায়নে সুস্পষ্ট ও অভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োজন। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তির অনৈতিক চাপ থেকে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ এলে রিভিউ প্যানেলের মাধ্যমে কার্যকর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেতে পারে। অনিয়ম পেলে ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তাসহ যে-ই দায়ী হোক, তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিজিটাল অডিট হতে হবে। সব তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।
তিনি বলেন, দরপত্র মূল্যায়নের পূর্ণাঙ্গ কার্যবিবরণী প্রস্তুত করে কোনো দরদাতাকে রেসপনসিভ (যোগ্য) বা নন-রেসপনসিভ ঘোষণার কারণ বিস্তারিত উল্লেখ করে তা ই-জিপিতে আপলোড করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. গোলাম ইয়াজদানী বলেন, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণে ক্রয়কারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা অর্জন করলেও চুক্তি ব্যবস্থাপনায় এখনও ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, চুক্তি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে এবং প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে না। অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত ভুল বা কারসাজির মাধ্যমে কেউ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে ক্রয়কারী ও ইকোনমিক অপারেটর; উভয়কেই জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ই-জিপি বড় অগ্রগতি আনলেও সংস্কার শুধু দরপত্র প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। দরপত্র আহ্বান থেকে কার্যাদেশ পর্যন্ত প্রক্রিয়া অনেকাংশে ডিজিটাল হলেও চুক্তি বাস্তবায়ন, কাজের অগ্রগতি, অতিরিক্ত কাজ অনুমোদন, সময় বৃদ্ধি, বিল যাচাই ও অর্থ পরিশোধ এখনও পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়নি। অথচ সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির বড় ঝুঁকি তৈরি হয় কার্যাদেশের পরের ধাপে। বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা থেকে চুক্তি সমাপ্তি ও শেষ বিল পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার দাবি জানান তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ বলেন, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো। তবে আইন যতটা শক্তিশালী, তার প্রয়োগ ততটা কার্যকর নয়। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই দুর্বলতা বেশি দৃশ্যমান।
আতিকুজ্জামান সাজিদ বলেন, এককালীন পণ্য বা সেবা ক্রয়ের তুলনায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিপিএ ও পিপিআরে পর্যাপ্ত ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে এই খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে শুধু ই-জিপি চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটালাইজ করা না গেলে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা কঠিন হবে। অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থার সংস্কারের ওপরেও গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার করতে পারে না। এ জন্য একটি স্বাধীন রিভিউ বোর্ড গঠন জরুরি। পাশাপাশি ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হেড অব প্রকিউরিং এনটিটি বা হোপকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আতিকুজ্জামান সাজিদ বলেন, সরকারি ক্রয়ে প্রকৃত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চুক্তির মূল্য যাই হোক না কেন, সব সরকারি চুক্তি অনলাইনে প্রকাশ করা উচিত। এতে সরকারি অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জনগণ জানতে পারবে এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বাড়বে।
সরকারি ক্রয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় বড় সংস্কার হলেও পরামর্শক নির্বাচনে এখনও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইনোভেট ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী রানা মাসুদ।
তিনি বলেন, আগ্রহপত্র থেকে কার্যাদেশ পর্যন্ত সময়সীমার তথ্য ই-জিপিতে থাকলেও প্রকাশ করা হয় না, ফলে বিলম্বের জবাবদিহিতা নেই; বিলম্ব কমানোও নিজেই একটি দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সংক্ষিপ্ত তালিকায় কোন যোগ্যতায় কোন স্তর, তার লিখিত সংজ্ঞা বা নম্বরভিত্তিক কাঠামো নেই; সমমানের বহু প্রতিষ্ঠান থেকে কীভাবে সাতটিতে নামানো হবে, তারও নির্দেশনা নেই– এই শূন্যতাই দরপত্র কারসাজি ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি করে। একটি প্রতিষ্ঠান একই সময়ে কতগুলো কাজ বহন করতে পারে, তারও সর্বোচ্চ সীমা নেই; ফলে ঘুরেফিরে একই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ পাচ্ছে।
কারিগরি প্রস্তাবের যে অংশে নম্বর সবচেয়ে বিষয়ভিত্তিক– মেথডলজি, কর্মপরিকল্পনা ও জনবল বিন্যাস– সেগুলো ই-জিপিতে কোড নম্বরে, পরিচয় গোপন রেখে মূল্যায়নের প্রস্তাব দেন তিনি; নম্বর চূড়ান্ত হওয়ার পরই পরিচয় উন্মুক্ত হবে। তিনি বলেন, দরপত্রে অস্বাভাবিক কম দর যাচাইয়ের নির্ধারিত পদ্ধতি থাকলেও পরামর্শক প্রস্তাবে তার সমতুল্য বিধান নেই। কারসাজি ঘটে চারটি পর্যায়ে– বিনির্দেশ প্রণয়নে, সংক্ষিপ্ত তালিকায়, কারিগরি মূল্যায়নে ও চুক্তির পর ভেরিয়েশন অর্ডারে; চারটিতেই প্রতিকার একটিই, সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশ।
ই-জিপি ব্যবস্থা অনলাইনে ও উন্মুক্ত হলেও টেন্ডার কারসাজির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ক্যান্ডর সায়েন্টিফিক হাউসের অ্যাপ্লিকেশন ব্যবস্থাপক ও ই-প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ বিভাষ বিশ্বাস। তাঁর মতে, সমস্যার জায়গা ই-জিপি পোর্টালে তথ্য লুকানোর মধ্যে নয়; বরং পোর্টালের বাইরে ম্যানুয়াল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে মূলত চার ধাপে কারসাজির সুযোগ তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা মডেলকে সুবিধা দিতে অযৌক্তিক শর্ত যুক্ত করা, পছন্দের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের বাদ দিতে অস্বাভাবিক টার্নওভার ও অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া, পক্ষপাতমূলক কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগ্য দরদাতাকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করা এবং একই ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষের বারবার একই ধরনের সুবিধাজনক শর্ত ব্যবহার।
টেন্ডার সিন্ডিকেট ও পাতানো দরপত্র ঠেকাতে তিনি চারটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। বড় টেন্ডার প্রকাশের আগে স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা, ডেটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, রেসপনসিভ বা নন-রেসপনসিভ ঘোষণার প্রমাণভিত্তিক কারণ প্রকাশ এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রমাণিত অনিয়ম বা আঁতাতের ঘটনায় টেন্ডার বাতিলের পাশাপাশি দায়ী কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংক্ষুব্ধ দরদাতাদের জন্য কার্যকর, নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ আপিল ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। বৈঠক সঞ্চালনা করেন সমকালের সহকারী সম্পাদক হাসান জাকির।
- বিষয় :
- গোলটেবিল
- গোলটেবিল আলোচনা
- দরপত্র