রক্তশূন্যতা: কারণ ও প্রতিকার
কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বয়স ও লিঙ্গভেদে হিমোগ্লোবিন যখন কাঙ্ক্ষিত মাত্রার নিচে অবস্থান করে, তখন সেই অবস্থাকে আমরা অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা বলি। হিমোগ্লোবিন হলো রক্তের সেই উপাদান, যা শরীরের কোষে কোষে জীবনদায়ী অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।
রক্তশূন্যতার প্রধান লক্ষণ
হিমোগ্লোবিন কমতে থাকলে শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। রক্তশূন্যতা হলে যা যা
হতে পারে–
সাধারণ দুর্বলতা: ক্লান্তি দানা বাঁধে, শরীর স্বল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠে এবং ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়।
হৃদযন্ত্রের সমস্যা: হৃৎপিণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। তীব্র রক্তশূন্যতা হার্ট ফেইলিওর পর্যন্ত করতে পারে। তখন হাত-পায়ে পানি জমে যায় এবং শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট হয়।
বাহ্যিক পরিবর্তন: শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে ক্ষত হয় এবং জিহ্বায় ঘা হয়। জিহ্বার গোড়ার পাপিলা ক্ষয় হয়ে মাংসের মতো লালচে হতে পারে।
ত্বক ও চুল: চুলের ঝলমলে উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। চুল ফেটে যায় এবং নখ ফেটে যায়।
অন্যান্য সমস্যা: এর ফলে স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী রক্তশূন্যতায় খাদ্যনালির ওপরের দিক চেপে যাওয়ায় ঢোক গিলতে কষ্ট হয়। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক হয়ে পড়ে অনিয়মিত।
জন্ডিস: লোহিত কণিকা ভেঙে রক্তশূন্যতা হলে জন্ডিস দেখা দিতে পারে।
সুতরাং রক্তশূন্যতার লক্ষণ কারণভেদে
বিভিন্ন হতে পারে।
কেন রক্তশূন্যতা হয়? (মূল কারণ)
রক্তশূন্যতা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো–
আয়রনের অভাব: আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা সারাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।
লোহিত কণিকা ভেঙে যাওয়া: রক্তে লোহিত কণিকা ভেঙে গেলে এ সমস্যা হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ: কিডনি বা লিভার বিকল হওয়া, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, আর্থ্রাইটিস, ক্যান্সার, যক্ষ্মাসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগে রক্তশূন্যতা হতে পারে।
বংশগত রোগ: হিমোগ্লোবিনের নিজস্ব রোগ, যেমন– থ্যালাসেমিয়াসহ অসংখ্য রোগে সৃষ্টি হতে পারে রক্তশূন্যতা।
আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতার নেপথ্যে
আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতার পেছনে যেসব কারণ দায়ী–
অপুষ্টি: খাদ্যে পর্যাপ্ত আয়রনের অভাব।
রক্তক্ষরণ: পেপটিক আলসার, বেদনানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েডের ফলে পাকস্থলীর ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ, কৃমির সংক্রমণ, পায়খানা কিংবা রজঃস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।
ঘন ঘন গর্ভধারণ: ঘন ঘন গর্ভধারণ ও আয়রনের ঘাটতি বাড়ায়।
করণীয় ও প্রতিকার
রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হলে প্রথমেই এর তীব্রতা কতটুকু, তা পরখ করে নিতে হবে এবং এর পেছনের কারণ খুঁজে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন: যেহেতু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতির কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়, সে জন্য খাদ্যতালিকায় লৌহসমৃদ্ধ খাবার যোগ করতে হবে। যেমন– লাল মাংস, গিলা, কলিজা, ছোট মাছ, লালশাক, কচুশাক, সবুজ শাকসবজি, আনাজ এবং ফলমূলের জোগান বাড়াতে হবে।
ভিটামিনের জোগান: ভিটামিন বি-১২ এবং ফলিক এসিডের ঘাটতির ফলেও রক্তশূন্যতা হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসকের পরামর্শে ফলিক এসিড ও ভিটামিন খেতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ: মনে রাখতে হবে, কোনো কোনো রক্তশূন্যতায় আয়রন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে সঠিক কারণ জেনে চিকিৎসা নিতে হবে।
লেখক : মেডিসিন স্পেশালিস্ট ও এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট
- বিষয় :
- রক্তদান কর্মসূচি
