হাম
প্রতিদিন হাসপাতালে হাজারের বেশি রোগী
প্রকোপ কমার আভাস, তবে পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৯ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ১২:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের একাংশ টিকাদান কর্মসূচির সুফল পেতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে মনে করলেও অন্য অংশ এখনই স্বস্তির কোনো সুযোগ দেখছেন না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে এক হাজার ১৬৮ জন শিশু, নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৯৩ জন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৪৩ জনের শরীরে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫১৯ শিশু। নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে আরও ৯১ জনের। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১০। একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৭৬ হাজার ৮৭৬ জনের মধ্যে এবং পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ হাজার ৫০৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬২ হাজার ২৮৭ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫৮ হাজার ১৫৪ জন, যা মোট ভর্তি রোগীর প্রায় ৯৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক মাসে হামের পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। গত ১ মে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিল এক হাজার ১৭০ জন। ৮ মে ছিল এক হাজার ২১২, ১৫ মে এক হাজার ১৯২, ২২ মে এক হাজার ২৬১ জন এবং ৫ জুন এক হাজার ১৬৮ জন।
অর্থাৎ রোগীর সংখ্যা কিছুটা ওঠানামা করলেও সার্বিকভাবে সংক্রমণের চাপ প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে।
জুনের মাঝামাঝি টিকাদানের সুফল
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, প্রথম ধাপে টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লেগেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। হামের প্রকোপ কমাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়া প্রয়োজন। জুনের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে।
সংক্রমণ কমার দাবি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে দেশে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০-এর মধ্যে। বর্তমানে তা এক হাজার ১০০-এর আশপাশে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, ঈদের আগে ও পরে সংক্রমণের হার কিছুটা কমেছে বলে আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে। তবে টিকাদান কর্মসূচির পূর্ণ সুফল পেতে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। টিকা নেওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। মে মাসের মাঝামাঝি যেসব শিশু টিকা পেয়েছে, তাদের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত হতে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলার সুযোগ নেই
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল পরিস্থিতি নিয়ে এখনই আশাবাদী নন। তাঁর মতে, মে মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে আসা রোগী কিংবা ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে– এমন দাবি করার সময় এখনও আসেনি।
তিনি বলেন, টিকাদান কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের ঘাটতি ছিল। অনেক এলাকায় কাঙ্ক্ষিত টিকা কভারেজ নিশ্চিত করা যায়নি। আবার পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে অনেক অভিভাবক সময়মতো শিশুদের টিকা দিতে পারেননি। কোনো এলাকায় হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশের বেশি টিকা কভারেজ প্রয়োজন। অনেক এলাকায় সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
- বিষয় :
- হাম
- স্বাস্থ্য
- জনস্বাস্থ্য
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
