ডেঙ্গু পরিস্থিতি
অনাগত সন্তানকে নিয়েই অনন্তলোকে নূরজাহান
নূরজাহান
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অপেক্ষা আর কয়েক দিনের, অক্টোবরেই নূরজাহানের প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসার কথা ছিল। সেই অপেক্ষা আর শেষ হলো না। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নূরজাহান। অনাগত সন্তানও তাঁর সঙ্গে গেছে অনন্তলোকে।
গত শুক্রবার সামান্য জ্বর হয়েছিল নূরজাহানের। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে কুমিল্লায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (পিজি) ভর্তি করা হলে সেখানে গতকাল বুধবার ভোর ৫টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
নূরজাহান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরের মোছাগাড়া গ্রামে। প্রায় দেড় বছর আগে জোবায়ের হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। জোবায়ের বলেন, আগামী মাসে আমাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল। সব শেষ হয়ে গেল।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে মারা যান অর্পিতা নামে আরেক অন্তঃসত্ত্বা। মৃত্যুর পর তাঁর পেট থেকে মৃত ছেলে সন্তান প্রসব করানো হয়।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে কতজন অন্তঃসত্ত্বা মারা গেছেন; এর আলাদা তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে মা ও অনাগত সন্তানের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ সময় রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় সামান্য দেরিও জটিলতা বাড়াতে পারে।
গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। এতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও ডেঙ্গু আক্রান্ত নন, এমন দুই ধরনের অন্তঃসত্ত্বা নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২৪৪ জন অন্তঃসত্ত্বার ওপর এই গবেষণা হয়েছে। ১২২ নারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিলেন, ১২২ জনের ডেঙ্গু ছিল না।
গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীর মধ্যে প্রসব জটিলতা হয়েছে ৩১ জনের। ডেঙ্গু আক্রান্ত নন– এমন নারীর মধ্যে এ সংখ্যা ১২। অর্থাৎ ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীদের প্রসব জটিলতার ঝুঁকি ২ দশমিক ৭৮ গুণ।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৯ নারী মৃত সন্তান জন্ম দেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত নন, এমন নারীর মধ্যে এ সংখ্যা ছিল ৯। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীর ১৬ শতাংশ মৃত সন্তান প্রসব করেন।
মৃত্যুর ক্ষেত্রেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীর মধ্যে পাঁচজন মারা যান। অন্যদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত নন এমন নারীর মধ্যে মারা যান একজন।
এ বিষয়ে এমএইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. নাহলা বারী বলেন, অন্তঃসত্ত্বা নারীর জ্বর, ঠান্ডা, কাশি— যে কোনো উপসর্গ থাকলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক আসাদুল কবীর বলেন, মাথাব্যথা, বুক ও পেটের সংযোগস্থলে ব্যথা এবং বমি ভাব— এসব ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে। তাই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সতর্ক থাকতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৭৫৩ জন। এটি চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির রেকর্ড। এর আগে গত সোমবার এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির রেকর্ড হয়েছিল। দুই দিনের ব্যবধানেই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল।
চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৬ হাজার ৯১৬ জন। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৭০ জন। অথচ পুরো আগস্টে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। অর্থাৎ মাস শেষ হওয়ার আগেই আগস্টের মোট রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি মাসে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৭৪ জন। আগস্টে মারা গিয়েছিলেন ৫৪ জন। এরই মধ্যে গত মাসের মৃত্যুর সংখ্যাও ছাড়িয়ে গেছে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)
- বিষয় :
- ডেঙ্গু
- মৃত্যু
- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
- গবেষণা