ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিনজো আবে: আবেনোমিকস তত্ত্বের প্রবক্তা

শিনজো আবে: আবেনোমিকস তত্ত্বের প্রবক্তা
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২২ | ০১:১৩

জাপানে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার রেকর্ডটি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের দখলে। আবে তার আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক কৌশলের কারণে বেশি পরিচিত ছিলেন। রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ৬৭ বছরের এই নেতার নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি ছিল, যেটিকে অনেকেই 'আবেনোমিকস' নামে ডাকেন। তিনি দু'বার জাপানের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০০৬ সালে সর্বপ্রথম জাপানের ক্ষমতায় আসেন তিনি। তবে সেবার তাঁর মেয়াদ এক বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি।

এরপর বিস্ময়করভাবে ২০১২ সালে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন শিনজো আবে। ২০২০ সালে স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয় মেয়াদে আবে যখন দায়িত্ব শুরু করেন জাপানে তখন অর্থনৈতিক মন্দা। তাঁর গৃহীত কাঠামোগত সংস্কার, মুদ্রা ব্যবস্থার সহজীকরণ, আর্থিক প্রণোদনা ও অর্থনৈতিক নীতির কারণে খুব সহজেই সচল হয়ে ওঠে জাপানের অর্থনীতি। ২০২০ সালে আবে পদত্যাগ করলেও জাপানের রাজনীতিতে তাঁর বেশ প্রভাব ছিল।
১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বরে টোকিওতে জন্ম নেওয়া আবের পরিবার আগে থেকেই জাপানের রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী। তাঁর নানা নবোসুকে কিশি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর বাবা এক সময় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৯৩ সালে আবে প্রথমবারের মতো এলডিপির টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমির চিফ কেবিনেট সেক্রেটারি নিয়োগপ্রাপ্ত হন তিনি। এর এক বছর পর তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী হন।

সে সময় তাঁর বয়স ছিল ৫২ বছর; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপান আর এত কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী দেখেনি। তবে ২০০৭ সালেই বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি। তাঁর সরকার জনগণের পেনশন রেকর্ড হারিয়ে ফেললে প্রায় পাঁচ কোটি জাপানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। তারপর ২০১২ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরে আসেন শিনজো আবে। এরপর একাধারে জিতেছেন ২০১৪ ও ২০১৭ সালের নির্বাচন। দায়িত্ব পালন করেন ২০২০ সাল পর্যন্ত। এই সময়ে তার জনপ্রিয়তা ওঠানামা করেছে, কিন্তু সবসময়ই তিনি ছিলেন চ্যালেঞ্জহীন।

প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রের বেলায় শিনজো আবে আগ্রাসী নীতির সমর্থক ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সংবিধানও বদলানোর চেষ্টা করেছেন। কারণ তিনি জানতেন, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া করা ওই সংবিধান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয়ের অন্যতম স্মারক। তাঁর আমলেই জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম দেশের বাইরে যুদ্ধ করার এবং মিত্র কোনো দেশ আক্রমণের শিকার হলে তাঁদের সুরক্ষায় সেনা পাঠানোর বিষয়টি অনুমোদন করে।

তবে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুচ্ছেদ বদলে জাপানের সেলফ ডিফেন্স ফোর্সকে আক্রমণাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ সেনাবাহিনীতে রূপান্তরে তাঁর যে দীর্ঘদিনের ইচ্ছা তা পূরণে তিনি ব্যর্থ হন। বিশ্বজুড়ে আবে বেশি পরিচিত ছিলেন তার সিগনেচার তত্ত্ব 'আবেনোমিকসের' জন্য, এর মাধ্যমে তিনি জাপানের অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছিলেন। তাঁর সময়েই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাণিজ্য শুল্ক্কের বোঝা থেকে রক্ষা পায় জাপান।

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাকাকে সচল করতে সুদের হার কমিয়ে ভোক্তা ও কোম্পানিগুলোকে ঋণ নেওয়া ও ব্যয়ের সুযোগ বাড়ানো, অবকাঠামো ও প্রণোদনায় সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমশক্তিতে আরও বেশি নারীকে যুক্ত করা এবং কাজের চাপ কমাতে বেশি অভিবাসী শ্রমিক নেওয়ার মতো নীতি গ্রহণ করেন আবে। এসব পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারলেও ২০২০ সালে কভিড-১৯ এর কারণে আবার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে জাপান। এ সময় তাঁর গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলে সমালোচকরা। আবের জনপ্রিয়তা আরেক দফা ধাক্কা খায়। তবে শতাংশের হিসাবে তা কখনোই অর্ধেকের নিচে নামেনি।

২০২০ সালের ২৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন আবে। এরপর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও দলের প্রচারে মাঝে মাঝেই অংশ নিতেন তিনি। গতকাল শুক্রবার জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নারাতে একটি নির্বাচনী প্রচারণায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর ওপর গুলি চালায় এক বন্দুকধারী। ওই হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়। বিবিসি।

আরও পড়ুন

×