ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

শরণার্থী থেকে রোডস স্কলার

শরণার্থী থেকে রোডস স্কলার
×

সামিয়া তোরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৫:৩৭ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৭:০০

নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তানে তালিবানদের উত্থানের পর সামিয়া তোরার  পরিবার পালিয়ে চলে আসে পাকিস্তানে। তারপর থেকে শরণার্থী হিসেবে সেখানে তিনি বেড়ে ওঠেন। সেদিনের সেই শরণার্থী মেয়েটি প্রথম আফগান নারী হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে নামি আর পুরনো বৃত্তিগুলোর একটি ‘রোডস স্কলারশিপ’ নিয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রি নিতে যাচ্ছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সামিয়ার এ সাফল্য খুব সহজে আসেনি। এজন্য তাকে বহু পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামিয়া জানিয়েছেন তার সাফল্যের পেছনের গল্প।  

আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসার পর পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে পেশোয়ারে সামিয়ার পরিবার আরও চারটা পরিবারের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন। সেখানে তাদের একটি মাত্র শোওবার ঘর ছিল। সেখানেই গাদগাদি করে থাকতে হতো তাদের। 

সেই সময়ের কথা স্মরণ করে সামিয়া বলেন, ‘ তখন প্রায়ই ড্রোনের শব্দ শোনা যেত। সপ্তাহে দু-একবার বোমাও পড়তো।’ তিনি জানান, এমন সংঘাত আর সহিংসতার মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি। এ গুলো তার জীবনের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনার মতো ছিল।  

তার মতে, তারপরেও আফগানিস্তানের তুলনায় পাকিস্তানে তারা অনেক ভালো ছিলেন।কারণ পাকিস্তানে অন্তত স্কুলে যাওয়ার অনুমতি ছিল মেয়েদের।

আগানিস্তানে থাকাকালীন সময়ের কথা স্মরণ করে সামিয়া জানান, ২০০২ সালে মার্কিন হামলার পর পরিবারের সঙ্গে কাবুল গিয়ে তিনি দেখেছিলেন কোনো মেয়ে স্কুলে গেলে তাকে ছেলে সেজে যেতে হতো।

সামিয়ার বয়স যখন ছয় বছর তখনই তিনি ঠিক মতো লেখাপড়ার করার প্রতিজ্ঞা করেন। পাকিস্তানে এসে শুরু হয় তার সেই যাত্রা। 

কিন্তু শরণার্থী হওয়ায় তার সেই যাত্রাও সহজ ছিল না। শরণার্থী হবার কারণে তার বাবা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাননি। সামিয়ার পড়াশুনার ক্ষেত্রেও ছিল নানা বাঁধা।

কিন্তু পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পে অটল থেকে তিনি খুঁজেছেন বিভিন্ন পথ। 

একদিন হঠাৎ অনলাইনে সামিয়া ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজ ইউডাব্লিউসি নামে একটি হাইস্কুলের খোঁজ পান। 

নিউ মেক্সিকোর ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী ছড়ানো তাদের ভিন্ন ভিন্ন ক্যাম্পাসে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়ার ব্যবস্থা করে।

ওই স্কুলে পড়ার চিন্তা থেকে ২০১৪ সালের মার্চে কাবুলের সেরেনা হোটেলে বসে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। তারপর দিনই ওই হোটেলে হামলা চালায় তালিবান। এতে ইউডাব্লিউসি'র কমিটির প্রধান রোশান থমাসসহ নয়জন নিহত হন।

এ ঘটনা সামিয়ার মনে প্রচণ্ড চাপ ফেলে। তার মনে পড়ে, ড. থমাস কিভাবে পরীক্ষার দিন সবাইকে আফগানিস্তানে ফিরে এসে নিজেদের যোগ্যতা কাজে লাগানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিলেন। 

সামিয়া জানান, রোডস স্কলারশিপে আবেদন করার অন্যতম কারণ ছিল ড. রোশান থমাস। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে শরণার্থী হিসেবে থাকা তার মতো শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার এমন সুযোগ নেওয়া উচিত।  

২০১৪ সালে জঙ্গিদের বোমায় পাকিস্তানের পেশোয়ারে ১৩৯ জন শিশু নিহত হওয়ার পরই সামিয়া পাকিস্তান ছাড়েন। ওই সময় ওখানে খুবই অনিরাপদ মনে হতো তার। মাথার ওপর প্রচণ্ড চাপও অনুভূত হতো।

সামিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যে আর্লহ্যাম কলেজে পড়াশোনা করছেন।

আসছে অক্টোবরে ২২ বছরের এই তরুণী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পড়াশোনা শুরু করবেন। 

যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্দেশ্যে অক্সফোর্ডে ১৯০২ সালে রোডস স্কলারশিপ চালু করা হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশের নাগরিকদেরই এই বৃত্তি দেয়া হতো।

ভিন্ন বর্ণের এবং বিশেষ করে নারীদের সুযোগ কম দেয়ার কারণে সামিয়া শুরুতে এতে আবেদনই করতে চাননি।

কিন্তু পরে মন পরিবর্তন করে আবেদন করেন এবং বৃত্তিটা পেয়েও যান। তার মতে, নিজের ঔপনিবেশিক ইতিহাস ভুলে যাবার বদলে, সেটা কাজে লাগিয়ে যদি রোডসের ধারা পরিবর্তন করা যায়, সেটাই হবে বড় লাভ।

আফগানিস্তানে এখনও শিক্ষিত নারী সংখ্যা কম। ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে নারীদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার এখন ১৭ শতাংশ।

সামিয়া রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রান্ট মুভমেন্ট নিয়ে অক্সফোর্ডে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি নিয়ে নিজের দেশ আফগানিস্তানে ফিরতে চান।

তবে তার দেখা বিধ্বস্ত ও ফাঁকা শহরের দেশে তিনি ফিরতে চান না। বরং বাবার কাছে গল্প শুনে যে উজ্জ্বল আফগানিস্তানকে তিনি চিনেছেন সেখানে ফিরতে চান।

সামিয়ার ভাষায়, তার মতো যারা উন্নত জীবনের সুযোগ সুবিধাগুলো পেয়েছেন, তাদেরকেই সেই আধুনিক আর উন্নত আফগানিস্তান গড়ে তুলতে হবে। সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন

×