ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঐতিহ্য

ইউরোপে এখনও যেখানে চলে ঘোড়ার গাড়ি

ইউরোপে এখনও যেখানে চলে ঘোড়ার গাড়ি
×

হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা রোমানিয়ার স্যাক্সন অঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতেই দেখা যায় এমন ঘোড়ার গাড়ি -বিবিসি

নূর মোহাম্মদ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৩:৩৪

প্রতিটি বাড়িতেই আছে গরু আর মেষ পাল। পণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম ঘোড়ার গাড়ি। নারীরা বাড়িতে তৈরি করেন টুপি, জুতা, মোজাসহ নানা কিছু। আধুনিকতাকে পাশ কাটিয়ে শত শত বছরের সংস্কৃতির আবহে কৃষিনির্ভর এক ছিমছাম জীবনযাপন। বলছি ইউরোপের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের গ্রাম টার্নভা মেরের কথা। প্রাচীনতম এই জনপদের অবস্থান রোমানিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সন এলাকায়।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আর আধুনিক জীবনযাপনে গোটা বিশ্ব যখন আকৃষ্ট ইউরোপে, তখনও সবকিছু পাশ কাটিয়ে আজও স্বরূপে চলছে এখানকার মানুষ। অনন্য স্থাপত্যশিল্প ফুটে উঠেছে ঘরবাড়ি আর চার্চের নির্মাণশৈলীতে। এটি এমন এক আকর্ষণীয় সংস্কৃৃতির প্রাচীন অঞ্চল, যা বিশ্বের আর কোথাও এখন আর পাওয়া যায় না।

নৈসর্গিক ওই স্যাক্সন এলাকাটিতে নির্মিত হয়নি সুবিশাল পিচঢালা পথ, সুরম্য অট্টালিকা আর আধুনিক সব নাগরিক সেবা। ফলে একুশ শতকে এসেও ঘোড়ার গাড়িই এখানকার মানুষের প্রধান বাহন। প্রত্যন্ত অঞ্চলটির প্রতিটি পরিবারেরই রয়েছে গরু আর মেষের পাল। ভোরে দলে দলে বেরিয়ে যাওয়া পশু গোধূলিবেলায় যখন ফিরে আসে, তখন সৃষ্টি হয় অন্যরকম এক আবহের।
ইউরোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক এলাকাগুলোর অন্যতম টার্নভা মেরেতে ১২ শতকে স্যাক্সনদের মাধ্যমে প্রথম বসতি স্থাপিত হয়েছিল, যা এখন জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসের অংশ। নিজস্ব অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় গেজার তাঁদের অঞ্চলটিতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল তুর্কিদের আক্রমণ থেকে তাঁর রাজ্যকে রক্ষা। তাঁরা কার্পাথিয়ান পর্বতমালার ঠিক উত্তরে উর্বর জমির একটি এলাকায় উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন। হামলা কিংবা যে কোনো দুর্যোগে নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করেছিলেন সুরক্ষিত গির্জা। শুধু তাই নয়, অর্থনীতির ভিত দৃঢ় করতে শক্তিশালী কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন স্যাক্সনরা।
বসতি স্থাপনের পর স্যাক্সনরা ৮০০ বছরেরও বেশি সময় টানা সমৃদ্ধি অর্জন করেন। অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেঁচে যান। কারণ, ওই সময় অনেককেই ধরে নিয়ে জার্মান সেনাবাহিনীতে যুদ্ধের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পরে আরও অধিক সংখ্যক মানুষকে সোভিয়েতরা সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরে কাজের জন্য পাঠায়। যদিও স্যাক্সনরা ২০ শতকের শেষ দশকে ট্রানসিলভেনিয়া থেকে কার্যত হারিয়ে যায়। বর্তমান স্যাক্সন অঞ্চলে জনসংখ্যা ৫০০ জনেরও কম।

যার মধ্যে মাত্র ১০ জন স্যাক্সন ভিস্ট্ক্রিতে বাস করেন। একই অবস্থা মেসেনডর্ফ, ক্রিস বা আশপাশের অন্যান্য গ্রামেও। যাঁরা বসতি স্থাপন করে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন, তাঁদের সংখ্যা দিন দিন কমলেও স্যাক্সনদের হাতে নির্মিত গির্জা আর ঘরগুলো এখনও রয়ে গেছে।

ভিস্ট্ক্রির প্রধান আকর্ষণ হলো এর সুরক্ষিত গির্জা। এটি যে কোনো হামলা বা দুর্যোগ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে গ্রামবাসীর কাছে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। টার্নভা মেরের সাতটি সুরক্ষিত গির্জার একটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। ১২ শতকে নির্মিত চার্চটি ১৫ শতকে সুরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা এবং এরপর বাইরের প্রাচীর ও প্রতিরক্ষামূলক টাওয়ার দিয়ে পরবর্তী ২০০ বছরে আরও আধুনিকায়ন করা হয়। মোটা দেয়াল দিয়ে স্টোর রুমগুলো তৈরি করা হয়। ভিস্ট্ক্রি আক্রমণের মুখে পড়লে গ্রামবাসী তাদের গবাদি পশু নিয়ে গির্জায় আশ্রয় নিত এবং নিরাপদ থাকত। বাকি সময়ে ঘরগুলো শুকনো হ্যাম এবং বেকন চর্বি রাখার জন্য ব্যবহূত হতো। চার্চের 'লার্ড টাওয়ার' প্রতি রোববার খোলা হতো, যাতে প্রতিটি পরিবার সপ্তাহে এক টুকরো চর্বি বা হ্যাম নিতে পারে। এটি একটি ঐতিহ্য, যা ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে হারিয়ে যায়।

গির্জা থেকে নেমে আসা রাস্তা এবং বাড়ির আশপাশের রাস্তায় ছোট ছোট স্টল রয়েছে। এর প্রতিটিতে পশমি মোজা, গ্লাভস ও রঙিন স্যান্ডেল সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। এসব তৈরি করে এখানকার নারীরা তাঁদের সংসারে আর্থিকভাবে অবদান রাখছেন।

ক্রিস্টিনা ভাসিলচে এসব তৈরির উদ্যোক্তাদের একজন। যিনি ১০ বছর ধরে প্রতিদিন দুই জোড়া স্যান্ডেল তৈরি করছেন। এসব একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করেন তাঁরা। ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে যতক্ষণ না জুতা মোলায়েম হয়, ততক্ষণ উল ও লিনেন জালে একাধিক স্তর সাবান ও পানি দিয়ে ঘষে মোলায়েম করেন তাঁরা।
হস্তশিল্প ছাড়াও বিগত কয়েক বছরে অঞ্চলটিতে চালু হয়েছে তাঁতি, ছুতার এবং কামারদের ব্যবসা। প্রাচীন কারুশিল্পের পুনরুজ্জীবন, ভিস্ট্ক্রিতে ইট- টালির হারানো শিল্পকে ফিরিয়ে আনতেও তৎপরতা চলছে। কেউ কেউ তৈরি করেন ঐতিহ্যবাহী সাসচিজ নীল মাটির নানা জিনিসপত্র।


আরও পড়ুন

×