‘প্রাদুর্ভাবের শুরুতে তথ্য গোপন করেছিল উহানের কর্তৃপক্ষ’
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২০ | ০০:৩৪ | আপডেট: ১৭ মে ২০২০ | ০১:০৪
নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রথম শুরু হয়েছিল চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে। গত ডিসেম্বরে এই শহরটিতেই প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন। চীন সরকারের একজন শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে থাকা ডা. ঝং নানশান বলেছেন, একেবারে শুরুর দিকে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের মাত্রা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছিল উহান কর্তৃপক্ষ। শনিবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. ঝং চীনে ‘সার্স হিরো’ হিসেবে পরিচিত। ২০০৩ সালে ছড়িয়ে পড়া সার্স ভাইরাসের সময় নায়োকচিত ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ১৭ বছর পর নতুন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রাথমিক পর্যায় থেকেই তা রোধে চীন সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
গত ২০ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. ঝং বলেন, নতুন করোনাভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে।
ডা. ঝংয়ের এই বক্তব্যের আগে মানুষ থেকে মানুষে ভাইরাসটি সংক্রমণের বিষয়ে তথ্য চেপে রাখার অভিযোগ আছে উহান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। তারা এও বলেছিল যে, ‘রোগটি প্রতিরোধযোগ্য এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব’।
চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের (এনএইচসি) হয়ে গত ১৮ জানুয়ারি ভাইরাসটির বিষয়ে তদন্ত করতে উহান যান ডা. ঝং। পৌঁছানোর পর অনেক চিকিৎসক ও মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা জানান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন দিচ্ছে, প্রকৃত অবস্থা তার চেয়েও খারাপ।
উহানের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যে কেন্দ্রীয় সরকারকে সঠিক তথ্য দিচ্ছিল না সে ব্যাপারে নিজেও নিশ্চিত হয়েছিলেন ডা. ঝং। তবে সেটা প্রাদুর্ভাবের একেবারে শুরুর দিকে। ডা. ঝং বলেন, ‘একেবারে শুরুর দিকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চুপ ছিল। তখন আমি তাদের বলেছিলাম, সম্ভবত বহু মানুষ ইতোমধ্যে সংক্রমিত হয়েছে।’
ডা. ঝংয়ের সন্দেহ তখনই শুরু হয় যখন টানা ১০ দিন ধরে উহানে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪১। অথচ ওই সময়টাতে চীনের বাইরেও সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। ডা. ঝং তখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন আসল তথ্য প্রকাশ করতে।
২০ জানুয়ারি বেইজিংয়ে ফিরে ডা. ঝং জানান, উহানে ১৯৮ জন সংক্রমিত হয়েছেন। মারা গেছেন তিন জন এবং ১৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
পরদিনই চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ডা. ঝং। সেই বৈঠকেই তিনি ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারকে খুব শিগগির উহান শহর লকডাউন করে দিতে আহ্বান জানান। ২৩ জানুয়ারি উহান লকডাউন করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় সব ধরনের যাতায়াত ব্যবস্থা। ৭৬ দিন পর সেই নজিরবিহীন লকডাউন তুলে নেওয়া হয়।
সিসিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গত ২৭ জানুয়ারি উহানের মেয়র ঝু জিয়ানওং স্বীকার করেন যে, সময়মতো তার সরকার তথ্য প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে স্থানীয় সরকার হিসেবে আমরা কেবল অনুমোদিত তথ্যই প্রকাশ করতে পারি।
দায়িত্বে ‘অবহেলার’ অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারিতে উহান ও হুবেই প্রদেশের বহু দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় সরকার।
প্রাদুর্ভাবের শুরুতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তথ্য গোপন করেছিল বলে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ডা. ঝং। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে চীনের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলেছে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। কারণ জানুয়ারির শেষ দিকে করোনাভাইরাস মোকাবিলার যাবতীয় কার্যক্রমের দায়িত্ব নিয়ে নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। ডা. ঝং বলেন, এরপর থেকে আর কোনো তথ্য গোপনের প্রশ্নই আসে না।
২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস থেকে চীন সরকার যথেষ্ঠ শিক্ষা নিয়েছে বলে জানান ডা. ঝং। সে সময়ও তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছিল চীনের বিরুদ্ধে। ডা. ঝং বলেন, এবার সে পরিস্থিতি হয়নি। কারণ চীন সরকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিল। বিশেষ করে ২৩ জানুয়ারির পর থেকে যে তথ্য সরকার দিয়েছে তা শতভাগ সত্য।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের দেশগুলোতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ডা. ঝং। তিনি মনে করেন, এসব দেশের সরকার ভাইরাসটিকে হালকাভাবে নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল এটি কোনো সাধারণ ফ্লু। তবে তাদের ভাবনা ভুল ছিল।
চীনে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না ডা. ঝং। তিনি মনে করেন, এখনও তার দেশ সেই ঝুঁকিতে রয়েছে। আবার অনেকের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তাদের নিয়েও দেশটির সরকার চিন্তিত বলে জানিয়েছেন ডা. ঝং। কারণ ভাইরাসটির কার্যকর টিকা আবিষ্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে টিকে থাকা একমাত্র বিকল্প।