ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে কাতর গাজা

মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে কাতর গাজা
×

গাজায় প্রতি পাঁচজনে একজন শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। ত্রাণ সহায়তা প্রবেশের হার সেখানে এখন খুবই সীমিত। তাই এ সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। খাবার বিতরণকেন্দ্রগুলোতে ক্ষুধার্ত মানুষের কাড়াকাড়ি। শুক্রবার গাজা সিটি থেকে তোলা -আলজাজিরা

সমকাল ডেস্ক 

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ০১:২৩ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ০৮:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাজা শহরের শাতি শরণার্থী শিবির। দুই বছর বয়সী ইয়াজান আবু ফুলের ক্ষীণ শরীর দেখানোর জন্য কাপড় খুলে ফেলেন মা নাইমা। শিশুটির মেরুদণ্ড, পাঁজর ও কাঁধের হাড় বেরিয়ে এসেছে; কুঁচকে গেছে নিতম্ব। মুখ তার অভিব্যক্তিহীন। ইয়াজানের বাবা মাহমুদও রোগা মানুষ। খাবারের সংকট তাঁকেও কাহিল করে ফেলেছে। ইয়াজানকে তার বাবা-মা বেশ কয়েকবার হাসপাতালে নিয়ে যান। ডাক্তাররা কেবলই বলেছেন, তাকে খাওয়াতে হবে। মা নাইমা তখন ডাক্তারদের বলেন, ‘আপনি নিজেই দেখছেন, খাবার নেই।’

নাইমা অন্তঃসত্ত্বা। তিনি বেগুন সেদ্ধ করে স্যুপের মতো খাবার তৈরি করেছিলেন। দুটি বেগুনের দাম ৯ ডলার। বেগুনের পানির পাত্রটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এটা খেলে শিশুরা অন্তত কয়েক দিন টিকে থাকবে। ইয়াজানের চার বড় ভাইবোন সবাইকে রোগা ও ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।

ইয়াজানের দুর্বল হাত তুলে ধরেন বাবা মাহমুদ। ছেলেটি দিনের বেশির ভাগ সময় মেঝেতে পড়ে থাকে। সে এত দুর্বল, হাড্ডিসার। তার ভাইদের সঙ্গে খেলতেও পারে না। তাকে মাটিতে ছেড়ে দেওয়া হলে মাটিতেই পড়ে থাকে। গতকাল শুক্রবার বার্তা সংস্থা এপির এক বর্ণনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।  

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি অবরোধে গাজার সিটি হাসপাতালে অপুষ্টির প্রাথমিক চিকিৎসাও আর মিলছে না। বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একের পর এক শিশু মারা যাচ্ছে। উত্তর গাজার পেশেন্টস ফ্রেন্ডস হাসপাতালে প্রতিদিন ক্ষুধার তাড়নায় কাতর শিশুর ভিড় বাড়ছে। পুষ্টিবিদ ডা. রানা সোবোহ বলছেন, গত সপ্তাহ থেকে মৃত্যুর ঘটনায় পরিবর্তন দেখা গেছে। এখন শিশুরা ক্ষুধা ছাড়া অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত নয়। তারা শুধুই ক্ষুধায় আক্রান্ত। শিশুরা নড়াচড়া, এমনকি কাঁদতেও পারে না।  

সোবোহ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাহায্য সংস্থা মেডগ্লোবালের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যে বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা বর্ণনার কোনো ভাষা নেই। গোটা বিশ্ব ক্ষুধায় মৃত্যু দেখছে। এর চেয়ে কুৎসিত আর ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে না।’ 

চলতি মাসে গাজার দুই মিলিয়নের বেশি বাসিন্দার মধ্যে ক্ষুধা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। অপুষ্টির সীমা অতিক্রান্ত। শিশুদের পাশাপাশি সাহায্যকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী ও বয়স্করাও অনাহারের শিকার। চারদিকে কঙ্কালসার দেহ। ক্ষুধার্ত বাসিন্দারা যেন জিন্দা লাশ।   

আলজাজিরা জানায়, গাজায় অনাহারে গতকাল শুক্রবার এক দিনে আরও ৯ জনের প্রাণ গেছে। এতে মোট মৃত্যু ১২২-এ পৌঁছেছে। মৃত অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, চলতি বছর অপুষ্টিজনিত কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানায়, জুলাই মাসে ১৩ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মেডগ্লোবালের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও শিশু বিশেষজ্ঞ ড. জন কাহলার বলছেন, তীব্র ক্ষুধায় মানুষ ক্যালোরির ঘাটতি নিয়ে বেঁচে আছে। এখন মনে হচ্ছে, আমরা সেই সীমা অতিক্রম করেছি। এটা শুধুই ‘একটি প্রজন্মকে হত্যা’।  

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলছে, প্রায় এক লাখ নারী ও শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। চিকিৎসাকর্মীরা বলছেন, তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ ফুরিয়ে গেছে। মেডিসিন্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) সতর্ক করে দিয়েছে, প্রতি চারজনের মধ্যে এক শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারী অপুষ্টিতে ভুগছেন। 

ইউনিসেফের মুখপাত্র সালিম ওয়েইস রয়টার্সকে বলেছেন, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি শিশুদের জন্য সত্যিই বিপজ্জনক। কারণ, তারা বর্তমানে ক্ষুধা ও অপুষ্টির মুখোমুখি। ওয়েইস বলেন, ইউনিসেফের কাছে মাত্র তিন হাজার শিশুর চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত খাবার অবশিষ্ট রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক মুখপাত্র বলেন, অপুষ্টির চিকিৎসার বেশির ভাগ চিকিৎসা সরঞ্জাম শেষ হয়ে গেছে।

বিবিসি জানায়, গাজায় ত্রাণ সরবরাহ না আটকাতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি। তারা এটাকে অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেছে।

যুদ্ধবিরতির আলোচনা ত্যাগ ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের
আলজাজিরা জানায়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকরা কাতারের রাজধানী দোহায় গাজায় যুদ্ধবিরতি আলোচনা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আলোচনা থমকে যাওয়ার জন্য ওয়াশিংটন হামাসকে দায়ী করেছে। এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, স্পষ্টতই গাজায় যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর কোনো লক্ষণ নেই। তবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প পন্থা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। হামাস বলেছে, ‘উইটকফের মন্তব্যে তারা হতবাক। আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী।’ 

পানিবাহিত রোগ প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছে: অক্সফাম
যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি দাতব্য সংস্থা ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রাণ বন্ধের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি জানায়, গত তিন মাসে গাজার অভ্যন্তরে প্রতিরোধযোগ্য এবং সহজেই চিকিৎসাযোগ্য পানিবাহিত রোগ প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছে। কারণ, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে সাহায্য বন্ধ করে দিচ্ছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে রক্তাক্ত ডায়রিয়া ৩০২ শতাংশ এবং তীব্র জন্ডিস ১০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগের তীব্রতা ‘দ্রুত মারাত্মক’ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। 

নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে ২৩২
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানায়, ইসরায়েলের হামলায় ফটোসাংবাদিক আদম আবু হারবিদকে হত্যা করা হয়েছে। ফলে গাজায় এ পর্যন্ত নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে ২৩২। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

আরও পড়ুন

×