ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীন-ভারত ‘পানিযুদ্ধ’

ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীন-ভারত ‘পানিযুদ্ধ’
×

.

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৫ | ০১:১৯ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৫ | ১১:৩৭

অরুণাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্রের ওপর বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে ভারত সরকার। এরই মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। উজানে চীনের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পাল্টা হিসেবে তারা এই পরিকল্পনা করছে।

এ বিষয়ে ঢাকার পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত সমকালকে গতকাল রাতে বলেছেন, চীন যদি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ড্যাম নির্মাণ করে, তাহলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। বরং উপকার হবে। যেমন কাপ্তাই ড্যামের কারণে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার জনপদ উপকৃত হচ্ছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য টারবাইন চালাতে পানি ছাড়তেই হবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাইরে পানি সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে বিপদ হতে পারে। শুধু চীন নয়, ভারতও ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন স্থানে ড্যাম নির্মাণ করেছে। তাই বাংলাদেশ ও ভারতের উচিত যৌথভাবে চীনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিম্ন অববাহিকায় পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা।

স্ট্রেটস টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, চীনা কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মেদোগ হাইড্রোপাওয়ার স্টেশন নির্মাণ অনুমোদন করে। এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। চলতি বছরের জুলাইয়ে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এটি মূলত বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ। এর জবাবে ভারত সরকার ১১.২ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট (ইউএসএমপি) ঘোষণা করেছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৩২০ কোটি ডলার।

চীনের পাল্টা প্রকল্প ভারতে
চীনা বাঁধের কারণে শুকনো মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের ভারতীয় অংশে পানির প্রবাহ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছে নয়াদিল্লি। সেই সঙ্গে পানিকে অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে বেইজিং। সম্ভাব্য এই সংকটের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ভারত এখন নিজেদের অংশে একটি বিশাল বাঁধ তৈরির পরিকল্পনায় অগ্রসর হচ্ছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, তিব্বতে হিমালয়ের ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে হিমবাহ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি। ওই এলাকায় এর নাম ইয়ারলুং সাংপো। পূর্বমুখী নদীটি তার উৎস থেকে ১৬০০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে ভারতের কাছে এসে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে বাঁক নিয়ে অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করেছে। তখন এর নাম হয়েছে সিয়াং। পরে এটি ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করে আসাম হয়ে বাংলাদেশে এসেছে।
ভারতের সরকারি বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে বলা হয়, তিব্বতে বাঁধ নির্মাণ করে চীন নদীর এক-তৃতীয়াংশ, বা বার্ষিক প্রায় চার হাজার কোটি কিউবিক মিটার পানি সরিয়ে নিতে পারবে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ কমবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কয়েক কোটি মানুষের জীবন, কৃষি এবং শিল্পের ওপর।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হয়েছে। এটি ভাটির দেশগুলোর জলসম্পদ, পরিবেশ বা ভূতত্ত্বের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না।’

ভারতের আরেকটি আশঙ্কা হলো, চীন এই নদীর পানিকে একটি ‘জলবোমা’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে খরা অথবা বর্ষায় হঠাৎ পানি ছেড়ে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
চীনের এ পদক্ষেপের জবাবে ভারত অরুণাচল প্রদেশে ‘আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ নির্মাণের পরিকল্পনাকে আবার সামনে এনেছে। কয়েক দশক ধরে এ পরিকল্পনাটি স্থানীয় মানুষের বিরোধের কারণে আটকে ছিল। কিন্তু চীন বাঁধ নির্মাণ শুরু করার পর ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এই বাঁধ তৈরি হলে ভারত প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি কিউবিক মিটার পানি ধরে রাখতে পারবে। ফলে শুকনো মৌসুমে সেই পানি ছেড়ে দিয়ে নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে। পাশাপাশি চীন হঠাৎ করে পানি ছাড়লে বন্যার হাত থেকে ভাটির অঞ্চলকে রক্ষা করা সম্ভব।

প্রতিবাদ করছেন ভারতের আদিবাসীরা
ভারতের এ বাঁধ নির্মাণের ঝুঁকিও আছে। অরুণাচল প্রদেশের আদিবাসীরা এ প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন। তাদের ভয়, এ বাঁধ নির্মাণ হলে তাদের প্রায় ২৭টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাবে। কয়েক হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারাবে। চাষের জমি, ফলের বাগান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জীবনযাত্রা ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে প্রায় এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

স্থানীয়দের বাধা সত্ত্বেও ভারত সরকার সশস্ত্র পুলিশের পাহারায় প্রকল্পের সমীক্ষা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নয়াদিল্লি এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ এবং সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করছে।
গত ২০ জুলাই সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফার্মার্স ফোরাম গেকুতে প্রতিবাদ সভা ডাকে। সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে বড় সমাবেশ ছিল এটি। সেখানে আপার সিয়াং এবং তার বাইরেরও কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। নেতারা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাতিল করা এবং এ অঞ্চলে মোতায়েন করা কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহারের দাবি জানান। তারা সিয়াংকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পবিত্র’ নদী হিসেবে ঘোষণা করেন। আদিবাসীরা জানান, এই নদী তাদের ‘মা’। এর প্রবাহ কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লিকেন লিবাং বলেন, ‘সিয়াং উপত্যকার মানুষ এই নদীর দানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।’

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হিমালয়ের এ অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ। এখানে বড় দুটি বাঁধ নির্মাণ করা হলে তা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। একটি বড় ভূমিকম্পে বাঁধ ভেঙে গেলে ভারত, চীন এমনকি বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্করী বন্যা হতে পারে। ১৯৫০ সালে এই অঞ্চলে ৮.৭ মাত্রার আসাম-তিব্বত ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। তখন প্রায় চার হাজার ৮০০ মানুষ মারা গিয়েছিল।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাহাড়ি সিয়াং উপত্যকায় সমীক্ষা চালিয়ে দেড় হাজারের বেশি বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, পোকামাকড়, পাখি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন। এই বাঁধ এসব প্রাণের জন্য হুমকি ডেকে আনতে পারে।

এ বিষয়ে ঢাকার পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত সমকালকে গতকাল বলেছেন, চীনের হিমালয়ের পাদদেশের তিব্বতে ইয়ারলুং জাংবো নদীতে যে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণ হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চীনের এ বিষয়ে নিয়মিত তথ্য বিনিময় হচ্ছে। আমার জানা মতে, চীন সব তথ্যই বাংলাদেশকে জানাচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রদূত আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, এ ড্যাম শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হবে।

আরও পড়ুন

×