ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

ভূরাজনীতি: নেপালে কেন বারবার সরকার পতন হচ্ছে

ভূরাজনীতি: নেপালে কেন বারবার সরকার পতন হচ্ছে
×

সরকারের দুর্নীতি ও সামাজিক মাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামেন তরুণ-তরুণীরা। গত সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুতে। ছবি: এএফপি

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৫:৫৬ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:৫৮

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকেও হিমালয়ের চূড়া দেখা যায়। কিন্তু সেখানকার রাজনৈতিক আকাশ প্রায়শই কালো মেঘে ঢাকা থাকে। 

গত কয়েক বছরে নেপালে একাধিকবার সরকার পতন হয়েছে, যা বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে এক ধাঁধার মতো মনে হতে পারে। এক সময় রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করে দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের সেই পথ বারবার বিক্ষোভ, অবিশ্বাস ও সরকার পতনের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক সংকটের গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

নেপালের রাজনৈতিক পটভূমি বোঝার জন্য কয়েক দশক পেছনে ফেরা যাক। দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে শাহ রাজবংশের নিরঙ্কুশ শাসন ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঢেউ লাগে। এই আন্দোলন ‘জন আন্দোলন’ বা ‘পিপলস মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ১৯৯০ সালে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে রাজা সীমিত ক্ষমতার অধিকারী হন। তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি।

২০০৬ সালে নেপালের রাজনীতিতে আসে বড় মোড়। দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানো মাওবাদী বিদ্রোহী ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন পরিচিত ‘জন আন্দোলন-২’ নামে। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজতন্ত্রের অবসান এবং একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। আন্দোলনের ফলে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের চূড়ান্ত অবসান ঘটে এবং নেপাল একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

আল জাজিরার তথ্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত নেপালে ১৩ বার সরকার বদল হয়েছে। এগুলোর পেছনে আছে একাধিক জটিল কারণ। যেগুলো ব্যাখ্যা করা যাক কয়েকটি ধাপে। 

২০১৫ সালে প্রথম দফায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী হন কে পি শর্মা অলি। দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পান ২০১৮ সালে। ফাইল ছবি: এএফপি

বাগমতীর তীরে ভাঙন 
বাগমতী নেপালের প্রধান নদী। এটি শিবপুরী নামের পাহাড়ে জন্ম নিয়ে রাজধানী কাঠমান্ডু হয়ে ভারতের গঙ্গায় মিলিত হয়েছে। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নদীকে নেপালে ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষীও বলা চলে। 

নেপালের রাজনীতিতে ভারত ও চীনের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্ত বাহাদুর থাপা। যেটি একটি সাময়িকীতে প্রকাশ হয় ২০২৩ সালে। থাপা লিখেছেন, নেপালে রাজনৈতিক সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। প্রধান রাজনৈতিক দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি)-তে এক সময় বিভক্তি দেখা দেয়। এর মাধ্যমে মূল দল ভেঙে দুটি দল গঠন হয়- কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ঐক্যবদ্ধ মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী কেন্দ্র) নামে। মতাদর্শ, কৌশল ও ব্যক্তিগত পার্থক্যের বিষয়গুলোই মূলত এনসিপির ভাঙনের কারণ ছিল।

নেপালি টাইমস, কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের বিভাজনের কারণে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে নেপালে কোনো একক রাজনৈতিক দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এর ফলে বারবার জোট সরকার গঠিত হয়েছে। এই জোটগুলো প্রায় সময়ই আদর্শগতভাবে ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হয়। যেখানে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের সময় কমিউনিস্ট পার্টির একাংশের শোভাযাত্রা। ছবি: সংগৃহীত

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, নেপালের গত ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাজনের রাজনীতি চলায় ক্ষমতাসীন মন্ত্রী, এমপিরা কেউই দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেননি। বরং তারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থেকেছেন। স্বজনপ্রীতি, সব ধরনের কাজে ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহার নেপালে একটি সাধারণ ঘটনা। 

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া’র নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নেপালে নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। যেটি রাজতন্ত্র পরবর্তী সময়ে জনগণের জন্য একটি বড় অর্জন ছিল। কিন্তু এই সংবিধান নিয়ে দেশের মধ্যে ব্যাপক বিভাজন তৈরি হয়। বিশেষ করে তরাই অঞ্চলের মধেশী জনগোষ্ঠী এই সংবিধানের কিছু বিধানের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন চালায়। তাদের অভিযোগ ছিল, সংবিধান তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেনি। 

ভারত-চীনের প্রভাব ও রাজতন্ত্রে ফেরার বাসনা
ভূ-রাজনৈতিকভাবে নেপাল অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চলের দেশ। এর উত্তরে চীন ও দক্ষিণে ভারত। উভয়ই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি। এই দুটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে।

ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শান্ত বাহাদুর থাপা তাঁর গবেষণায় লিখেছেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও চীন উভয়ই নেপালে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষা করে চলে। নেপালের পররাষ্ট্রনীতিও ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

থাপা লিখেছেন, নেপালের রাজনৈতিক বিষয়ে ভারতের সম্পৃক্ততা বিতর্কিত একটি বিষয়। কারণ এটি প্রায়ই সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অপরদিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর মাধ্যমে চীন ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে। চীন নেপালকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এবং অনেক রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেছে। এর ফলে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতিও বেড়েছে।

ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক লিখেছেন, ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নেপালের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উভয় দেশই এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কৌশলগত লক্ষ্য অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভারত বা চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আরও জটিল করেছে। 

নেপালে রাজতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে হওয়া মিছিল। গত মার্চে কাঠমান্ডুতে। ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের মার্চে নেপালে রাজতন্ত্র পুনর্বহালের দাবিতে কাঠমান্ডুতে একটি মিছিল হয়। যেখানে নেপালের সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্রর পোস্টারের পাশাপাশি প্রদর্শন করা হয় ভারতের উত্তর প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ছবি। 

ওই মিছিলের প্রেক্ষাপটে গত ২৮ জুন একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট। এতে লেখা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নেপালে রাজতন্ত্রের সমর্থনে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছে। যেখানে কিছু বিক্ষোভকারী ভারতের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পোস্টারও বহন করেছেন। এই প্রতীকী প্রদর্শন কাকতালীয় নয়। এটি নেপালের রাজতান্ত্রিক স্মৃতিকাতরতা ও ভারতের ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের মধ্যে এক আদর্শিক মিলনের ইঙ্গিত বহন করে। 

ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং এর আদর্শিক অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কিছু অংশের কাছে নেপালে হিন্দু রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা কেবল এক সভ্যতাগত বিজয় নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। নেপালে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য সাংস্কৃতিকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ, হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজতন্ত্রের ধারণা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। সমর্থকরা যুক্তি দেন, একজন হিন্দু রাজা বেইজিংয়ের প্রভাবের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন। এই বয়ানও ইতোমধ্যে ভারতীয় ডানপন্থী ভাষ্যকার ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। 

বিপরীত চিত্রও বর্ণনা করেছে দ্য ডিপ্লোম্যাট। তারা লিখেছে, নেপালের রাজতন্ত্র কখনোই ভারতীয়দের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। ১৯৫০ সালে নির্বাসিত হয়েছিলেন নেপালের রাজা ত্রিভুবন। পরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সহায়তায় নিজ দেশে ফেরেন। তখন নেপালে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই আশা দ্রুত ভেস্তে যায়। ১৯৬০ সালে রাজা মহেন্দ্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভারতের সমর্থনপুষ্ট রাজনীতিবিদদের দমন করেন। তাঁর সময়ে চীনের সঙ্গে নেপালের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। যা পরে মহেন্দ্রর ছেলে জ্ঞানেন্দ্রও (২০০৫-০৮) অব্যাহত রাখেন। 

১৯৬৭ সালে নেপালের রাজা মাহেন্দ্রর চীন সফরের একটি মুহুর্ত। পাশে মাও সেতুং। ছবি: সংগৃহীত

গণতন্ত্রকামী সংগঠনগুলোর আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে নেপালে ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পতন হয় রাজা জ্ঞানেন্দ্রর শাসনকাল। তবে সম্প্রতি জ্ঞানেন্দ্রর রাজতন্ত্র ফেরানো নিয়ে ফের দাবি উঠেছে। দ্য ইকোনমিক টাইমস বলছে, গত মার্চে প্রায় ১০ হাজার বিক্ষোভকারী ত্রিভূবন বিমানবন্দরের সামনে শোভাযাত্রা করেন। তারা ফের রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

জেন-জি’রা যা করল
সম্প্রতি নেপালে ক্ষমতাসীন দলগুলোর মন্ত্রী ও নেতাদের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। যেগুলো ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সরকারের বিরুদ্ধে এসব প্রচার বন্ধ করতেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। 

কে পি শর্মার পদত্যাগের পর নেপালের প্রশাসনিক ভবনে ঢুকে পড়ে ছাত্র-জনতা। গতকাল মঙ্গলবার। ছবি: এএফপি

কে পি শর্মা অলির সরকার নিজেদের অনিয়ম ঢাকতে চাইলেও ফেসবুক, ইউটিউবের ওপর নিষেধাজ্ঞা লাখো নেপালির রুটি-রুজির ওপর সরাসরি আঘাত হানে। দেশটির ২০ শতাংশের বেশি বেকার তরুণ সামাজিক মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। খবর, বিনোদনের পাশাপাশি অনেকে এসব মাধ্যম থেকে আয় করেন। যা তাদের স্বার্থে সরাসরি আঘাত হানে। ফলাফল ক্ষোভে ফেটে পড়ে তরুণরা। দুই দিনের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন কে পি শর্মা। 

আরও পড়ুন

×