৮ ঘণ্টা পর রেলপথ ছাড়ল রাবি শিক্ষার্থীরা, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগে রেললাইন অবরোধ করা হয়। ছবি-সমকাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ২০:১৯
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগে রেললাইন অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিভাগীয় কমিশনার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ায় মঙ্গলবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ৮ ঘণ্টার বেশি সময় সারা দেশের সঙ্গে রাজশাহীর রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এতে এক ডজন ট্রেনের চলাচল সূচি বিপর্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। এতে তীব্র দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী বিরতিহীন বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকালে নির্দিষ্ট সময়ে রাজশাহী স্টেশন থেকে ছেড়ে আসে। তবে শিক্ষার্থীদের অবরোধে ট্রেনটি ভদ্রার জামালপুর এলাকায় এসে থেমে যায় ট্রেনটি।
রেল চলাচলের সার্বিক বিষয়ে মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার দিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ সমকালকে বলেন, আমাদের ১০টি ট্রেনের সূচি বিপর্যয় হয়েছে এবং বনলতা এক্সপ্রেস ও দুটি মেইল ট্রেনের সূচি বাতিল হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীরা ট্রেনের টিকেট বাতিল করতে চাইলে আমরা তাদের টিকেটের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। এ ছাড়াও দেরিতে থাকা ট্রেনের বিষয়ে যাত্রীদের মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে ট্রেনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করছি। এ ছাড়া ট্রেনের সামগ্রিক সূচির সমন্বয় করতে আমাদের কিছু সময় লাগবে। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব।
শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে ৫টি সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বিভাগীয় প্রশাসন। সিদ্ধান্তগুলো হলো- রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ৩ সদস্যের ও বিভাগীয় কমিশনের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, গভীর রাতে রাজশাহীতে প্রবেশ করা ৩টি ট্রেনের বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা বিরতি দেওয়া, ট্রেনের সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শাটল বাস সেবা চালু, আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ এবং আগামী ৬ আগস্ট সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে পুনরায় সভা।
বিভাগীয় প্রশাসন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার রাতে ঢাকা থেকে রাজশাহী অভিমুখী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও হেনস্তা অভিযোগ ওঠে দায়িত্বরত টিটিই সুমন আলীর বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে সকাল ৭টায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সামনে রেললাইন অবরোধ করে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিভাগীয় কমিশনারের সভা কক্ষে আলোচনায় বসেন বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা। সভায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত টিটিই সুমন আলী শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং উচ্চতর তদন্তে ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
এ বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে সভায় যোগ দেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। পরে সোয়া ৩টায় সভার রেজুলেশন নিয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, আমাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আমরা সার্বিক বিষয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। আমরা অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চাই। সাময়িক অসুবিধায় দীর্ঘ সমস্যা সমাধান আসবে আশা করি।
সভা শেষে বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের ঘটনাটি নিয়ে আমরা শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিসহ সকলকে নিয়ে দীর্ঘ সভা করেছি। সভায় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৪টি দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা আহত শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। তাদের দাবি অনুযায়ী গভীর রাতে রাজশাহীতে প্রবেশ করা ট্রেনগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রাবিরতির জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। আমরা চাই, এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম সমকালকে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনভিপ্রেত ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ সভায় কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় কমিশনার অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে আমাদের দাবি মেনে নিয়েছে এবং আমাদের সহযোগিতা করেছেন। তারা আলাদা দুটি কমিটি গঠন করেছেন এবং অভিযুক্ত টিটিইকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছেন। দ্রুতই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন- রেলওয়ের বিভাগীয় কমিশনের জেনারেল ম্যানেজার ফরিদ আহমেদ, প্রধান প্রকৌশলী আহম্মদ হোসেন মাসুম, প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া, চিফ অপারেটিং সুপারিন্টেনডেন্ট (পশ্চিম) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, চিফ কমানডেন্ট (পশ্চিম) মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম, উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) আশিক সাইদ, আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুনুর রশীদ, প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, সহকারী প্রক্টর ড. আব্দুস সালাম, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ফোরকান উদ্দিন।