সমকাল এক্সপ্লেইনার
ইলন মাস্ক যেভাবে হাফ ট্রিলিয়নিয়ার, গরিব আরও গরিব হচ্ছে
মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। ফাইল ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:৫১ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:০৩
বিশ্বের মোট জনসংখ্যা আর ইলন মাস্কের সম্পদের হিসাব দিয়ে শুরু করা যাক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য, পৃথিবীতে বর্তমান জনসংখ্যা ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন। অর্থ্যাৎ, ৮০০ কোটির বেশি। মাস্কের ৫০০ বিলিয়ন ডলার এত সংখ্যক মানুষের মাঝে সমানভাবে ভাগ করলে প্রতিজনের ভাগে পড়বে ৬২ দশমিক ৫ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৬০৯ টাকা।
ইলন মাস্কের একদিনের আয়ের হিসাবটাও দেখা যাক। মাস্কের একদিনের আয়ের হিসাব স্থির নয়। তবে গত বছরের অক্টোবরে টেসলার শেয়ারমূল্য ২২ শতাংশ বৃদ্ধির পর ফরচুন সাময়িকী জানিয়েছিল, ওই মাসে মাস্কের একদিনের আয় ছুঁয়েছিল ৩৪ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের মাঝে সমানভাবে ভাগ করলে প্রতিজন পাবে ১৯৪ দশমিক ২৯ ডলার বা প্রায় ২৩ হাজার ৬৯৩ টাকা।
অর্থ্যাৎ, ২০২৫ সালে এসে বিশ্বের মোট সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই একজন ব্যক্তির হাতে। তাই প্রশ্ন উঠছে, ইলন মাস্কের এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ এলো কোথা থেকে?
ফোর্বস সাময়িকীর ২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইলন মাস্কের সম্পদ গত বুধবার কিছু সময়ের জন্য ছুঁয়েছিল ৫০০.১ বিলিয়ন ডলার। অর্থ্যাৎ, হাফ ট্রিলিয়ন ডলার। (বিলিয়ন বলতে ১ হাজার মিলিয়ন বা এক হাজার কোটি বোঝায়, আর ট্রিলিয়ন বলতে ১ হাজার বিলিয়ন বা এক লাখ কোটি।) যদিও পরে তা ৪৯৯.১ বিলিয়নে নেমে যায়। ফোর্বস বলছে, সম্পদ বৃদ্ধির বর্তমান হার যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ২০৩৩ সালের মার্চেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হবেন বর্তমানে ৫৪ বছর বয়সী মাস্ক।
মাস্কের অর্থের উৎস
রয়টার্স, এপি ও ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, টেসলা এখনো মাস্কের সম্পদের মূল ভিত্তি। চলতি বছর কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫০ বিলিয়ন ডলার। আর মাস্ক বর্তমানে টেসলার ১২–১৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক। এই পরিমাণ শেয়ারের বাজারমূল্য প্রায় ১০০-১১০ বিলিয়ন ডলার।
কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা- বছরে ২০ মিলিয়ন বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করা এবং রোবোট্যাক্সি চালু করা। বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলে টেসলার বাজারমূল্য ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
_1759667747.jpg)
মাস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম আয়ের উৎস স্পেসএক্স। গত আগস্টে কোম্পানিটির মূল্যায়ন ছিল ৪০০ বিলিয়ন ডলার। যেখানে মাস্কের মালিকানা ৪২ শতাংশ বা ১৬০-৭০ বিলিয়ন। স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট স্টারলিংক ইন্টারনেটের গ্রাহক ২.৭ মিলিয়ন। যা কোম্পানির বার্ষিক আয়ে যোগ করে ১০ বিলিয়ন ডলার।
এরপরে আছে যথাক্রমে এক্সএআই, নিউরোলিংক ও এক্স (আগের টুইটার)। এর মধ্যে শুধু এক্সএআইয়ের সবশেষ মূল্যায়ন ছিল ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
ধার করে শুরু
মানুষের ভবিষ্যৎ যে প্রযুক্তিকেন্দ্রিক হতে যাচ্ছে মাস্ক তা নব্বইয়ের দশকেই বুঝতে পেরেছিলেন। গুগল বাজারে আসার আগে (১৯৯৮) মাস্ক ১৯৯৫ সালে ম্যাপিং সফটওয়্যার জিপ২ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্পদ বলতে কিছু ছিল না। বাবা ইরল মাস্কের থেকে ২৮ হাজার ডলার ধার নিয়ে জিপ২ এর ব্যবসা শুরু করেন। সহযোগী ছিলেন তাঁর ভাই কিমবল মাস্ক।
১৯৯৯ সালে মাস্ক জিপ২ বিক্রি করে দেন। কারণ, পরিচালনা পর্ষদ মাস্ককে সিইও পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। মূলত এই বিক্রির উদ্যোগই মাস্ককে প্রথমবার মিলিয়নিয়ার (২২) করে।
জিপ২ থেকে পাওয়া অর্থ মাস্ক পরে বিনিয়োগ করেন অনলাইন ব্যাংক এক্স ডটকমে। যেটির উদ্যোক্তা ছিলেন আরও তিনজন। তৎকালীন সময় বিবেচনায় মাস্কের এই উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ডাক কিংবা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে মাস্ক অর্থ লেনদেনের কাজ সহজ করেছিলেন।
এই উদ্যোগ নিয়ে সিবিএস মার্কেট ওয়াচকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে মাস্ক বলেছিলেন, মার্কিন নাগরিকরা তখন ইন্টারনেটের কয়েকটি ধাপের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। প্রথমে তারা ইন্টারনেট দিয়ে শুধু তথ্য জানতো। এরপর অনলাইনে টুকটাক কেনাকাটা শুরু করে। ১৯৯৯ সালটি ছিল তৃতীয় ধাপের। যেখানে মানুষ ইন্টারনেট দিয়ে অর্থ লেনদেনের জন্য প্রস্তুত ছিল।
_1759667983.jpg)
নিউজ উইকের তথ্য অনুযায়ী, এক্স ডটকম পরে পরিচিতি পায় পেপাল নামে। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ই-কমার্স কোম্পানি ‘ইবে’ দেড় বিলিয়ন ডলারে পেপালকে অধিগ্রহণ করে। এ থেকে মাস্ক পান ১৮০ মিলিয়ন। এই পরিমাণ অর্ধ দিয়ে মাস্ক পরে আরও একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগ করেন। যার মধ্যে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্পেসএক্স। ২০০৪ সালে টেসলায় বিনিয়োগ করে চার বছর পর এটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হন। মাস্কের অন্য কোম্পানির মধ্যে আছে নিউরোলিংক (কম্পিউটারে মস্তিষ্কের ইন্টারফেস), দ্য বোরিং কোম্পানি (টানেল নির্মাণ), এক্স এআই ও এক্স (আগের টুইটার)। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মাস্কের নিট সম্পদের মধ্যে (৪৯৯.১) বড় অংশই আসে টেসলা (৭০%) থেকে। স্পেসএক্স থেকে এসেছে ২০ শতাংশ।
দুটি স্টার্টআপ ও আজকের মাস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করেন ডেভিড আকার। ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক ব্যবসায়িক পরামর্শদাতা একটি কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান তিনি। ইলন মাস্কের ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করে লিংকডইনে একটি পোস্ট দিয়েছেন ডেভিড।
ডেভিডের মতে, ব্যক্তি হিসেবে মাস্ক খুব বেশি সুবিধার না। তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, বদমেজাজি, কর্মীদের হঠাৎ বরখাস্ত করেন, কৃতিত্ব ভাগাভাগি করেন না। কিন্তু তবুও তিনি সফল হয়েছেন। কীভাবে হলেন?
ডেডিভ আকার লিখেছেন, এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো জিপ২ ও পেপালের (শুরুতে ছিল এক্স ডটকম) ভূমিকা। এসব স্টার্টআপ ৪ বছরের কম সময় স্থায়ী হলেও মাস্ককে যথেষ্ট পুঁজি এনে দেয়। প্রায় ২৫০ মিলিয়ন। এ দুটি স্টার্টআপেও মাস্কের বদমেজাজ প্রকাশ পেয়েছে। কারণ তিনি, কৌশলগত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অন্য কর্মীদের সঙ্গে আপস করতেন না। ফলে বড় মূলধন এনে দিলেও মাস্ক দুটি থেকেই সিইও এর পদ হারান।
ডেভিড আকার বলছেন, মাস্কের সফলতার মূল চাবিকাঠি ছিল প্রাথমিক বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এবং উচ্চ ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা। যা তাঁকে আজকের ইলন মাস্ক বানিয়েছে।
রাজনীতি, অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা
মাস্কের সম্পদ অর্জন কেবল তাঁর ব্যবসা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবন্ধ নেই। এটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে বড় অর্থ বিনিয়োগ (১১৯ মিলিয়ন) করেছিলেন মাস্ক। লাভও পেয়েছেন। সিএনএনের তথ্য, ট্রাম্পের জয়ের পর মাস্কের সম্পদ রাতারাতি ১৫ বিলিয়ন বাড়ে। কেবল টেসলার শেয়ারমূল্য বেড়েছিল ৪১১ মিলিয়ন।
গত দুই বছরে ইলন মাস্কের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ বলছে, বিশ্বের ১৮টি দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন, নীতি ও প্রশাসনকে ইলন মাস্ক উৎসাহ দিয়েছেন। ডানপন্থীদের এসব আন্দোলন অভিবাসন হ্রাস ও ব্যবসার ওপর থেকে স্থানীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমিয়েছে।

সম্প্রতি জার্মানিতে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের পেছনে মাস্কের ভূমিকা দেখা হচ্ছে। মাস্ক ব্রাজিল ও আয়ারল্যান্ডে ডানপন্থী সড়ক আন্দোলনের প্রতিও সমর্থন জানিয়ে অনলাইনে পোস্ট দিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের নতুন রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রীকেও স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আর্জেন্টিনা ও ইতালির ডানপন্থী নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট সেন্সর করার ব্যাপারে ভারত ও তুর্কিয়ের (তুরস্ক) ডানপন্থীদের অনুরোধও মেনে নিয়েছে মাস্কের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম এক্স।
এনবিসির প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বলা হয়, মাস্কের বিপুল সম্পদ বিশ্বে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এসব দেশে মাস্কের কোম্পানির প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটলে তাঁর আয় যে আরও বাড়বে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গরিব-গরিবই থাকছে
চলতি বছরের শুরুতে ‘টেকারস নট মেকারস’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম। এতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত মানুষ এখনও একাধিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। মহামারির ক্ষত এখনো রয়ে গেছে ঋণের বোঝা, কম মজুরি ও খাদ্য পণ্যের উর্ধ্বমুখী দামের মধ্যে।
অক্সফাম বলছে, বিশ্বে সংঘাতও বাড়ছে, যা আরও দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্যকে তীব্র করছে। বিপরীতে গত বছরের নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়াটা ধনকুবেরদের সম্পদে বিশাল উল্লম্ফন এনেছে।
যদিও সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে, কিন্তু বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্যসীমার (দৈনিক ৬.৮৫ মার্কিন ডলার ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে) নিচে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা আজও ১৯৯০ সালের সমান- প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন। অন্যদিকে, বৈষম্যের এক অদ্ভুত সমান্তরালে, ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি বিশ্বের মোট সম্পদের প্রায় ৪৫% দখল করে আছে।
_1759668580.jpg)
অক্সফাম বলছে, ২০২২ সালের পর থেকে অধিকাংশ দেশে দারিদ্রের সূচক কমানোর উদ্যোগে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্বে পাঁচটির মধ্যে চারটি দেশ তাদের বাজেট থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় কমিয়েছে। আর দশটির মধ্যে নয়টি দেশ শ্রম অধিকার ও ন্যূনতম মজুরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছে। এই প্রবণতা দ্রুত রোধ করা না গেলে ৯০ শতাংশ দেশেই অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়বে।
মাস্ক কলোনি ও একটি প্রশ্ন
অক্সফাম তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় গত বছর ধনকুবেরদের সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল তিনগুণ বেশি। এটি অব্যাহত থাকলে আগামী দশকের মধ্যে অন্তত পাঁচজন ট্রিলিয়নিয়ার পাবে বিশ্ব।
সুতরাং বলা যায়, ইলন মাস্কের একক সম্পদ শুধু তাঁকেই ট্রিলিয়নিয়ার বানাবে না, বরং বিশ্বে একটি ‘মাস্ক উপনিবেশ’ তৈরি করবে। ১৮টি দেশে তাঁর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব দেখলেই সেটি অনুমান করা যায়। এটি আমাদের এক নতুন যুগে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সম্পদ শুধু অর্থ নয়- নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা। তাই প্রশ্ন ওঠে, যে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আমরা তৈরি করছি, সেখানে কতজনের জায়গা হবে?
