ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’: জাতিসংঘ কি কোণঠাসা হতে যাচ্ছে?

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’: জাতিসংঘ কি কোণঠাসা হতে যাচ্ছে?
×

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৭:২০ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:২৩

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ হিসেবে ‘বোর্ড অব পিস’ চালু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চ থেকে এ উদ্যোগের ঘোষণা দেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষায়, এই বোর্ড ‘দশকের পর দশক ধরে চলা রক্তপাত বন্ধ করে একটি স্থায়ী ও সুন্দর শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে’।

তবে আন্তর্জাতিক মহলে এই উদ্যোগ নিয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে জাতিসংঘের বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা।

ফাঁস হওয়া বোর্ডের খসড়া সনদ অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প আজীবনের জন্য এর চেয়ারম্যান থাকবেন। বোর্ডের সদস্য আহ্বান, নতুন সংস্থা গঠন বা বাতিল এবং নিজের উত্তরসূরি মনোনয়নের ক্ষমতাও থাকবে তার হাতে। নতুন কোনো দেশ স্থায়ী সদস্য হতে চাইলে দিতে হবে ১০০ কোটি ডলার।

এই উদ্যোগে ইউরোপ বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমাদের নিয়ে কেউ যেন খেলা না করে।’ অন্যদিকে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, ‘ট্রাম্প মানেই শান্তি।’

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার বলেন, ‘এই প্রস্তাব অনেক বড় প্রশ্ন তৈরি করছে, বিশেষ করে শান্তি উদ্যোগে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে।’ সুইডেন ও নরওয়েও আপাতত এতে যোগ না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া এই বোর্ডে যুক্ত হতে আগ্রহী। তবে মস্কো জানিয়েছে, তারা এখনো মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছে। এদিকে গাজায় ‘ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি’র শর্তে কয়েকটি মুসলিম দেশ সীমিতভাবে এতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখালেও বোর্ডের খসড়া সনদে গাজার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

জাতিসংঘকে নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যও বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এই বোর্ড সম্পূর্ণ হলে আমরা জাতিসংঘের সঙ্গে মিলেও যা চাই তা করতে পারব।’

আবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ চাইলে প্রতিস্থাপিতও হতে পারে- ওরা খুব একটা কার্যকর হয়নি।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা ও ভেটো রাজনীতির কারণে জাতিসংঘের শান্তি প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা আগেই প্রশ্নবিদ্ধ। সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা মার্টিন গ্রিফিথস মনে করেন, ট্রাম্পের উদ্যোগ জাতিসংঘের ব্যর্থতার প্রতিফলন হলেও এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি রয়েছে।

তবে বিশ্বনেতারা মনে করেন, এই নতুন ক্লাবে যোগ না দিলে তার মূল্য দিতে হতে পারে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁকে হুঁশিয়ারিও দেন ট্রাম্প। পছন্দের অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তার ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক বসাব, তখন সে যোগ দেবে। তবে তাকে যোগ দিতেই হবে এমন নয়।’

শুধু স্লোভেনিয়া প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব স্পষ্ট করে বলেন—এটি ‘বিপজ্জনকভাবে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করছে।’

এই উদ্বেগের জবাব ট্রাম্প সরাসরি দেন। বলেন, ‘এই বোর্ড পুরোপুরি গঠিত হয়ে গেলে, আমরা প্রায় যা ইচ্ছা তাই করতে পারব এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করেই তা করব।’

এই মন্তব্যের একদিন আগে ফক্স টিভির এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার বোর্ড কি জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করবে। তিনি জবাব দেন, ‘হয়তো করবে। জাতিসংঘ খুব একটা সহায়ক হয়নি।’

এরপর তিনি যোগ করেন, ‘জাতিসংঘের সম্ভাবনার আমি বড় ভক্ত, কিন্তু সংস্থাটি কখনোই সেই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার করতে পারেনি। আমি যে যুদ্ধগুলোর মীমাংসা করেছি, সেগুলো জাতিসংঘেরই মিটিয়ে ফেলা উচিত ছিল।’

শান্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারীর নতুন দাবিদার

১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘ বহু আগেই কার্যত শান্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রথম মেয়াদের একেবারে প্রথম দিনেই শক্তি হারিয়েছে সংস্থাটি। 

গত এক দশকে জাতিসংঘের প্রচেষ্টা বারবার ব্যাহত হয়েছে—অচল নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধে শান্তি ব্যাহতকারী পক্ষ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার কারণে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিগুলোর তুলনায় সংস্থাটির নিজস্ব অবস্থান ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়ার কারণেও।

তবে মানবিকবিষয়ক ও জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এই আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল সতর্ক করে বলেন, ‘গত ৮০ বছরে অসংখ্য ব্যর্থতা ও জড়তার মধ্য দিয়ে আমরা যা শিখেছি, তা হলো অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব। অর্থাৎ, এটি কেবল ট্রাম্পের বন্ধুদের জন্য নয়, বরং বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষে প্রতিনিধিত্বশীল থাকা সম্পর্কেও প্রযোজ্য।’

গুতেরেস নিজেও সম্প্রতি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এমন মানুষও আছেন যারা মনে করেন; আইনের শাসনের জায়গায় শক্তির শাসন আসা উচিত।’

ট্রাম্প ক্রমাগত দাবি করেন, তিনি আটটি যুদ্ধের ইতি টেনেছেন। এ বিষয়ে বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে গুতেরেসের কাছে জানতে চাওয়া হলে বাস্তববাদী ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘ওগুলো যুদ্ধবিরতি।’ এর কিছু ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে।

রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর মধ্যে অস্থায়ী শান্তি চুক্তি দ্রুত ভেস্তে যায়, সীমান্তে পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ফের শুরু করে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড, আর পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের অবসানে ট্রাম্পের কেন্দ্রীয় ভূমিকার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত।

তবে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের দৃঢ় মধ্যস্থতাই কার্যকর হয়েছিল।

গাজায় বিধ্বংসী সংঘাতের অবসানে গত অক্টোবরে তার (ট্রাম্প) ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে—যা একদিকে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ কমায়, অন্যদিকে ইসরায়েলি জিম্মিদের যন্ত্রণা লাঘব করে।

আরব মিত্রদের অনুরোধ ও শোকাহত ইসরায়েলি পরিবারগুলোর চাপে কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে এই বিপর্যয়ের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেন ট্রাম্প। তখন তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও হামাসের মধ্যে সমঝোতার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।

তবু বোর্ডের প্রথম পরীক্ষা—গাজা যুদ্ধের অবসানে চুক্তির প্রথম ধাপ থেকে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়া। এটি অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

এই নতুন বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন নেতানিয়াহু ও আরব নেতারা। নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে অঙ্গীকার করেছেন। আরব নেতারা মনে করেন যে, টেকসই শান্তির একমাত্র পথ হলো ফিলিস্তিনিদের স্বশাসন ও ইসরায়েলি দখলদারির অবসান।

আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের এজেন্ডায় থাকা আরেক বড় যুদ্ধ হলো ইউক্রেন। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মস্কো ও মিনস্কের সঙ্গে একই টেবিলে বসতে অনীহা দেখিয়েছেন।

ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ডে’র অধীনে রয়েছে তিনটি স্তর—যার বেশিরভাগই গাজাকেন্দ্রিক। সেগুলো হল— নির্বাহী বোর্ড, গাজার একটি নির্বাহী বোর্ড ও গাজা প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটি।

এগুলোতে একত্রিত হয়েছেন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ও বিলিয়নিয়াররা, পাশাপাশি গাজা সম্পর্কে অভিজ্ঞ সাবেক রাজনীতিক ও সাবেক জাতিসংঘ দূত, আরব মন্ত্রী ও গোয়েন্দা প্রধান এবং ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটরা। কিছু সমালোচকও স্বীকার করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার একটি পুরোনো বিতর্ক আলোচনায় এনেছেন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ কাঠামোটির সংস্কারের অবিরাম দাবি, বিশেষ করে এমন একটি নিরাপত্তা পরিষদকে নিয়ে। এটি এখন আর বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের প্রধান শক্তির রাজনৈতিক মানচিত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এটি আসলেই উদ্দেশ্য অনুযায়ী কার্যকর নয়।

জাতিসংঘের সাবেক উপ-মহাসচিব মার্ক মালক ব্রাউন মন্তব্য করেছেন, ‘হয়তো ট্রাম্প যা করেছেন, তার একটি অনিচ্ছাকৃত ভালো পরিণতি হলো—এই বিষয়গুলো আবার আন্তর্জাতিক এজেন্ডার শীর্ষে উঠে আসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দুর্বল জাতিসংঘ নেতৃত্বের একটি সময়কাল থেকে বেরিয়ে আসছি, এবং আমার মনে হয়, এটি হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপের একটি আহ্বান।’ পরিহাসের বিষয় হলো, বিশ্বকে শান্তির পথে নেতৃত্ব দেওয়ার ট্রাম্পের উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন অনেক রাজধানীতে গুতেরেসের উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা জোরদার হচ্ছে। গুতেরেস এ বছরের শেষে তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করবেন।

একদিনেই ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন—এক সময় মন্তব্য করেছিলেন যেই প্রেসিডেন্ট। তিনি ক্ষমতার শেষ বছরে এসে শিখেছেন— শান্তি প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া।

তবু আজ তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরেন, যেখানে এখন কেবল ‘ছোটোখাটো সংঘাত’ চলছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ইউক্রেনে একটি সমঝোতা ‘খুব শিগগিরই আসছে।’

আর সম্ভাব্য প্রধান শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের নতুন ভূমিকায় ট্রাম্প দারুণ উচ্ছ্বসিত। তিনি ঘোষণা করেন, ‘এটি বিশ্বের জন্য।’

আরও পড়ুন

×