সিএনএনের অনুসন্ধান
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এপস্টেইন নথি থেকে ‘গায়েব’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেফরি এপস্টেইন। ১৯৯৭ সালে ফ্লোরিডায়। ছবি: সংগৃহীত
সিএনএন
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২০:২৬ | আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২০:৩৭
যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত প্রকাশিত নথি থেকে বেশকিছু সাক্ষাৎকার গায়েব হয়েছে বলে ধারণা করছে সিএনএন। মার্কিন গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, এসব নথির মধ্যে এক নারীর তিনটি সাক্ষাৎকার ছিল। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন।
সম্প্রতি এপস্টেইন সংক্রান্ত কয়েক লাখ নথি প্রকাশ করে মার্কিন বিচার বিভাগ। তাতে এফবিআইয়ের নেওয়া বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার (ভুক্তভোগীদের) ছিল। এপস্টেইনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের আইনজীবীদের সরবরাহ করা প্রমাণের তালিকায় এফবিআইয়ের নেওয়া ৩২৫টি সাক্ষাৎকারের ক্রমিক নম্বর আছে। তবে বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নথি পর্যালোচনা করে বুধবার সিএনএন জানিয়েছে, সেই তালিকার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি, অর্থাৎ ৯০টিরও বেশি নথি পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজ এসব নথিগুলোর মধ্যে এমন এক নারীর তিনটি সাক্ষাৎকার আছে, যিনি এফবিআই এজেন্টদের বলেছিলেন, ১৩ বছর বয়স থেকে তিনি এপস্টেইনের দ্বারা বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একই নারী ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন।
এই নিখোঁজ নথিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে মঙ্গলবার ডেমোক্রেটিক পার্টির এক আইনপ্রণেতা বিচার বিভাগের তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এপস্টেইন সংক্রান্ত নথিগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন যথাযথ আইন মেনে চলেছে কি?
মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া সিএনএনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন একজন ভুক্তভোগী আছেন যিনি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। কিন্তু এফবিআই ওই ভুক্তভোগীর যে সাক্ষাৎকারগুলো নিয়েছিল, সে সংক্রান্ত বেশ কিছু নথি এখন নিখোঁজ। সেগুলোতে কোনো প্রবেশাধিকার পাওয়া যাচ্ছে না।’
এপস্টেইনের সঙ্গে মিলে কোনো ধরনের অন্যায় করার কথা ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই অস্বীকার করেছেন। হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও চাঞ্চল্যকর’ বলে অভিহিত করেছে। পাশাপাশি তারা বিচার বিভাগের আগের একটি বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি আছে।’
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলোর নথির বিবরণ নিয়ে এর আগে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন স্বাধীন সাংবাদিক রজার সলেনবার্জার ও মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআর। তবে বিচার বিভাগের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, এপস্টেইন সংক্রান্ত কোনো নথি সরানো বা মুছে ফেলা হয়নি। বিচার বিভাগ আইন মেনেই কাজ করছে।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, জেফরি এপস্টেইন গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক দিন পর ২০১৯ সালের ১০ জুলাই এক নারী এফবিআইয়ের হটলাইনে ফোন করে জানান, তিনি এপস্টেইনের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এর দুই সপ্তাহ পর এক আইনজীবীর কার্যালয়ে এফবিআই এজেন্টরা ওই নারীর সাক্ষাৎকার নেন।
সাক্ষাৎকারের বিবরণ (নথি নম্বর ৩০২) অনুযায়ী, ওই নারী এজেন্টদের জানান দক্ষিণ ক্যারোলিনার একটি বাসায় এপস্টেইন তাঁকে বেশ কয়েকবার নির্যাতন করেছিলেন। শিশু দেখাশোনা করার কাজের সূত্রে তিনি বাসাটিতে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য, সে সময় বয়স ছিল আনুমানিক ১৩ বছর। তখন থেকেই নির্যাতন শুরু হয়।
নথি অনুযায়ী, সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে ওই নারী এজেন্টদেরকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও এপস্টেইনের ছবি দেখান। তখন তাঁর আইনজীবী এজেন্টদের জানান, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম জড়াতে ভুক্তভোগী ভয় পাচ্ছেন।
গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সম্পাদিত কিছু নথি থেকে এই অভিযোগের আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। গত বছর (২০২৫) এফবিআইয়ের তৈরি করা একটি প্রেজেন্টেশনে এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট ‘বিশিষ্ট ব্যক্তিদের’ তালিকায় জনৈক এক নারীর (নাম গোপন রাখা হয়েছে) অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, এপস্টেইন পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর ট্রাম্প ওই নারীকে যৌনকর্মে বাধ্য করেছিলেন। তাঁর মাথায় আঘাত করেছিলেন। ঘটনাটি ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে ঘটেছিল।
অন্য একটি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর সঙ্গে দক্ষিণ ক্যারোলিনার ঘটনার একটি যোগসূত্র আছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের জন্য এফবিআই দপ্তরে নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল। তবে ওই নারীর অভিযোগের বিষয়ে এফবিআইয়ের তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়িয়েছে তা স্পষ্ট নয়।
গত গ্রীষ্মে এফবিআই এজেন্টদের মধ্যে আদান-প্রদান করা একটি ইমেইলে উল্লেখ করা হয়, ‘শনাক্ত হওয়া একজন ভুক্তভোগী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান।’ তবে এই নারী এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার বাসায় শিশু দেখাশোনা করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী একই ব্যক্তি কি না তা ইমেইলটিতে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।
(সিএনএন-এ দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি লিখেছেন কেসি টোলান ও ইজাবেল চ্যাপম্যান। সেখান থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করা হয়েছে।)
