বিশ্লেষণ
খার্গ দ্বীপ দখল করে ইরানকে চাপে ফেলার কৌশল
হানযালা হান
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ১০:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
পারস্য উপসাগরে মাত্র ৫ বর্গমাইল আয়তনের খার্গ দ্বীপ। চারপাশে ইসলামী রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের বা আইআরজিসির কড়া নজরদারি। ছাড়পত্র ছাড়া প্রবেশ নিষেধ দ্বীপটিতে। এমনকি ইরানিদেরও সেখানে যেতে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। বুশেহর প্রদেশের দ্বীপটিতে গত শুক্রবার রাতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই ইরানের ‘অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড’ হিসেবে পরিচিত দ্বীপটি নতুন করে বিশ্বগণমাধ্যমে শিরোনামে এসেছে।
কী আছে ছোট্ট দ্বীপটিতে, কেন এটাকে কেন্দ্র করে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি তেল স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করবেন। ডাকছেন মেরিন সেনাদেরও।
কার্যত এ দ্বীপে হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। ইরান যুদ্ধ শুরু ও হরমুজ প্রণালি বন্ধের পর আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি তেল সংকট তৈরি হয়। সেই সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশই এ দ্বীপ দিয়ে হয়ে থাকে। এতে হামলা হওয়ায় উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর তেলক্ষেত্রগুলোতে পাল্টা হামলা চালাতে পারে ইরান। ইতোমধ্যে তারা সে বার্তা দিয়েছে। এমনটা হলে তেলের সরবরাহ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গতকাল সন্ধ্যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বাসিন্দাদের দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর, আবুধাবির খলিফা বন্দর ও ফুজাইরাহ বন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে অবিলম্বে সরে যেতে বলেছে ইরান। এর মধ্যে ফুজাইরাহ বন্দরের দিনে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে। আবুধাবির সিংহভাগ অপরিশোধিত তেল এ বন্দর দিয়ে যায়।
অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিপলোহাউস’-এর পরিচালক হামিদরেজা গোলামজাদে বলেন, খার্গ দ্বীপের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এটা ট্রাম্পের এজেন্ডাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তিনি জানান, মার্কিন বাহিনী সচেতনভাবে দ্বীপটির তেল অবকাঠামোগুলোকে এড়িয়ে গেছে। গোলামজাদের মতে, যুদ্ধের মধ্যে ইরান তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। নতুন হামলা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে কেমন প্রভাব ফেলে– এখন সেটাই দেখার বিষয়।
ইরানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, আগ্রাসনকারী ও তাদের মিত্রদের তেল ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর হরমুজ প্রণালিতে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। কেউ চলাচলের চেষ্টা করলে হামলা করা হবে।
দ্বীপটি কি যুক্তরাষ্ট্র দখলে নেবে?
খার্গ দ্বীপে মার্কিন মেরিন সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের আভাস, জাপান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। তারা শুধু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম পদাতিক বাহিনীই নয়, তারা খার্গ দ্বীপের তেল শোধনাগার নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের অর্থনীতি ভেঙে দেওয়া। এর মাধ্যমে তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা ও যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি ঘটানো।
এক বিশ্লেষক বলেন, সমুদ্র ও স্থল– উভয় ক্ষেত্রে লড়াইয়ে সক্ষম একটি ‘হাইব্রিড’ বাহিনীকে সামনে নিয়ে আসা কৌশলী চেষ্টা। এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে তাদের এ যুদ্ধে পদাতিক বাহিনী ব্যবহারের কথা স্পষ্ট করে বলেনি।
মার্কিন বাহিনী খার্ক দ্বীপ দখল করতে পারলে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি মূল ভূখণ্ডে হামলার জন্য একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র পাবে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন এ বিষয়ে মন্তব্য না করলেও মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার মেরিন সেনাসহ যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরের দিকে পাঠানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকি ক্যাস বলেন, দ্বীপটি কবজা করতে পারলে তা ইরানের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে। তাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা কমবে।
কেন দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ
বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ও ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত এ দ্বীপ। এর মাধ্যমে ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়া করা হয়। প্রতিবছর এখানে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল (প্রায় ১৫৯ লিটারে এক ব্যারেল) তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
আট কিলোমিটার দীর্ঘ এবং চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার প্রস্থের এ দ্বীপের চারপাশের গভীর সমুদ্র একে ভৌগোলিক সুবিধা দিয়েছে। এ গভীরতার কারণে সুপার ট্যাঙ্কারগুলো নিরাপদে নোঙর করতে পারে। মূলত এশিয়ার (প্রধানত চীন) জাহাজগুলো তেলবোঝাই করতে পারে।
ইরানের তেল মন্ত্রণালয়ের মতে, এই দ্বীপের স্থাপনাগুলো জ্বালানি খাতের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানকার টার্মিনাল তিনটি অফশোর ক্ষেত্র– আবুইজার, ফোরুজান ও দোরুদ থেকে অপরিশোধিত তেল গ্রহণ করে। এরপর সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মাধ্যমে তা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। শেষে রপ্তানির জন্য মজুত বা জাহাজে তোলা হয়।
বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে উৎপাদন ব্যাহত হলেও ইরান এই দ্বীপের অবকাঠামো সম্প্রসারণ করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস জানায়, তেহরান ২৫ ও ২৬ নম্বর ট্যাঙ্ক সংস্কারের মাধ্যমে টার্মিনালটির মজুত ক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়িয়েছে।
খার্গ দ্বীপে হামলা এ প্রথম নয়। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এ দ্বীপে বোমাবর্ষণ করা হয়েছিল। এর ক্ষত আজও বিদ্যমান। সূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস ও তাসনিম।
- বিষয় :
- ইরানে আগ্রাসন
