দুটি পর্বতমালা, দুটি মরুভূমি, দুটি সাগর: ইরানের ভৌগোলিক বাস্তবতা ‘সবচেয়ে বড় অস্ত্র’
ছবি: মিডল ইস্ট আই
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ২৩:০৬
সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটির সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা শক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দুই পর্বতমালা, দুটি বিস্তীর্ণ মরুভূমি এবং উত্তর-দক্ষিণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ- এই সব মিলিয়ে ইরানে সামরিক অভিযান অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের গবেষক আরমান মাহমুদিয়ান বলেন, ‘ইতিহাসে দেখা যায়, স্থল আক্রমণ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হয়ে যায়।’
ইরানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তিনটি প্রধান সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা দিতে পারে: উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর দ্বীপ দখল, ইরানের দক্ষিণ উপকূলে আক্রমণ অথবা পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে আগ্রাসন। এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে গুরুতর ঝুঁকি ও জটিলতা।
কৌশলগত অবস্থান ও হরমুজ প্রণালি
ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা বৈশ্বিক চাহিদার বড় অংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। ফলে অঞ্চলটি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আনার সম্ভাব্য কৌশল নিয়েও আলোচনা চলছে।

দ্বীপ দখলের ঝুঁকি
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুশেহর প্রদেশের ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র প্রবালদ্বীপ ইরানিদের কাছে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামে পরিচিত। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কঠোর পাহারায় থাকা এই দ্বীপে কেবল বিশেষ অনুমতি পাওয়া ব্যক্তিরাই যেতে পারেন।
বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়। বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এখান থেকে বিদেশে যায়।
দ্বীপটির চারপাশের গভীর পানি জ্বালানি তেলের বিশাল জাহাজগুলো নোঙর করার জন্য এক প্রাকৃতিক আশীর্বাদ। এখান থেকেই প্রধানত এশিয়ার বাজারে, বিশেষ করে চীনে তেল রপ্তানি করা হয়। ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতে, তিনটি প্রধান তেলক্ষেত্র- আবোজার, ফোরুজান ও দোরুদ থেকে তেল এখানে আসে এবং প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানের উপকূলঘেঁষা খার্গ দ্বীপসহ অন্যান্য দ্বীপ দখলের ধারণা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ, দ্বীপ দখল করলেও তা ধরে রাখা কঠিন হবে এবং ইরান পাল্টা হামলার মাধ্যমে বড় ক্ষতি করতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দ্বীপ দখল করলে তেমন লাভ হবে না, বরং উল্টো ফলও হতে পারে।
মাহমুদিয়ান বলেন, ‘ইরান হয়তো দ্বীপে লড়াইই করবে না। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বীপ দখল করতে দেবে, তারপর সেখানেই তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাবে।’
একই সমস্যা কেশম, হরমুজ ও লারাক দ্বীপেও দেখা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দ্বীপ দখল করলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
দীর্ঘ উপকূলরেখা, দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
ইরানের দক্ষিণ উপকূল প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এতে যেমন প্রতিরক্ষা কঠিন, তেমনি আক্রমণকারীদের জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূল দখল করতে গেলে বাহিনীকে ভেতরের দিকে অগ্রসর হতে হবে, যা সংঘাত আরও জটিল করে তুলতে পারে। সেক্ষেত্রে ইরানকেও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
মাহমুদিয়ান বলেন, ‘আপনি উপকূল দখল করতে পারেন, কিন্তু আপনার বাহিনী সবসময় আক্রমণের মুখে থাকবে। তাদের সুরক্ষায় আরও ভেতরে অগ্রসর হতে হবে, আর তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।’
ইরানের বিশাল আয়তন এখানে বড় ভূমিকা রাখবে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে তারা হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম।
পর্বতমালা ও মরুভূমির বাধা
ইরানে রয়েছে জাগরোসসহ একাধিক দুর্গম পর্বতমালা এবং দাশতে কাবির ও লুত মরুভূমির মতো বিস্তীর্ণ এলাকা। দেশটির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট দামাভান্দ প্রায় ৫,৭০০ মিটার উঁচু। এসব প্রাকৃতিক বাধা স্থলযুদ্ধে আক্রমণকারী বাহিনীর অগ্রগতি ধীর করে দিতে পারে। পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকা হয়ে আক্রমণের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করলেও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি কঠিন হবে।
মাহমুদিয়ান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কুর্দি বাহিনীকে সামনে এগিয়ে দেবে, কারণ তারা ভূখণ্ড চেনে। কিন্তু এতে তাদের বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি থাকবে।’ আরও গভীরে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য স্থলযুদ্ধে ইরানের পক্ষে বড় সুবিধা এনে দেবে। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও পাহাড়ের নিচে অবস্থিত, যা আক্রমণ করা কঠিন এবং প্রতিরক্ষা করা সহজ।
কৌশল নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল এখনো স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য বা আলোচনায় বাধ্য করার চেষ্টা- কোনোটিই এখনো কার্যকর হয়েছে বলে দৃশ্যমান নয়।
তাদের মতে, ইরানের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, ভৌগোলিক জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের সামরিক প্রস্তুতি মিলিয়ে যেকোনো স্থলযুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
