ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সুপার এল নিনোর পূর্বাভাস, জ্বালানি-কৃষিতে কেমন প্রভাব পড়বে

সুপার এল নিনোর পূর্বাভাস, জ্বালানি-কৃষিতে কেমন প্রভাব পড়বে
×

সুপার এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ার কোথাও কোথাও অতিবৃষ্টি হতে পারে। ফাইল ছবি: এএফপি

এএফপি

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ১৮:৫৬ | আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ | ১৯:২১

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এমনিতেই বিপর্যস্ত এশিয়া। এর মধ্যেই এবার শক্তিশালী ‘এল নিনো’র পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যা এ অঞ্চলের দেশগুলোতে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস এবং ফসলের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

প্রাকৃতিকভাবেই জলবায়ুগত একটি পরিবর্তন হলো- এল নিনো। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যেই এল নিনোর প্রভাব শুরু হতে পারে।

এদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, প্রাথমিক লক্ষণ অনুযায়ী এবার ব্যাপক পরিসরে এল নিনো দেখা যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা উল্লেখ না করলেও অনেকে এটিকে ‘সুপার এল নিনো’ বলে অভিহিত করছেন। এশিয়ার জন্য এটি মোটেও ভালো খবর নয়। কারণ ঐতিহ্যগতভাবেই এল নিনোর কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলো তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভুক্তভোগী হয়।

স্বাভাবিক সময়ে আবহাওয়ার যে গতানুগতিক ধরন থাকে তা এল নিনোর কারণে বদলে যায়। যেমন- সাধারণত স্থলভাগে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, তা স্থলে না হয়ে সমুদ্রের মাঝামাঝি অঞ্চলে চলে যায়। এর ফলে খরার ঝুঁকি বাড়ে। এটি সাধারণত, প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা যায়। সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে এর পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ইন্দোনেশিয়ার একটি বনাঞ্চলে আগুন লাগে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ছবি: এএফপি

অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী পিটার ভ্যান রেনশ বলছেন, সমুদ্রের গভীরে এখন পর্যন্ত যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তা বেশ শক্তিশালী। বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৯৭-৯৮ সালের মতো মনে হচ্ছে। ওই সময় ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো দেখা দিয়েছিল।

তবে পূর্বাভাস নিয়ে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা আছে। ভ্যান রেনশ সতর্ক করে বলছেন, শেষ পর্যন্ত এল নিনো পুরোপুরি তৈরি নাও হতে পারে।

প্রভাব কেমন হতে পারে
১৯৯৭ সালের এল নিনো এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। সে সময় ইন্দোনেশিয়ায় চরম খরা এবং বিধ্বংসী দাবানলে কয়েক লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এবার এশিয়ার দেশগুলো যখন জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে ঠিক তখনই এল নিনোর সতর্কতা এলো।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি ও অর্থনীতি বিষয়ক সংস্থা ‘আইইইএফএ’র বিশেষজ্ঞ হানিয়া ইসাদ বলছেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে অনেকে ঘরবাড়ি ও অফিস শীতল রাখতে চাইবেন। যা জ্বালানি সংকটে থাকা বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

এএফপিকে হানিয়া ইসাদ বলেন, চলমান সংকটের মধ্যে এল নিনোর কারণে চাহিদা বাড়লে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে জ্বালানি ব্যবহারের ওপর আরো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। কিন্তু এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি কমে যায় তাহলে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মাঝে এল নিনোর প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি খাত। ছবি: এএফপি

বৈশ্বিক জ্বালানি বিষয়ক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘এম্বার’-এর এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক দিনিতা সেতিয়াওয়াতি জানান, এল নিনোর প্রভাবে এই অঞ্চলের কিছু অংশে যে খরা দেখা দিতে পারে, তা জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

কৃষিতে ঝুঁকি
গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া কৃষির জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। সার ও জ্বালানি সংকটের কারণে এরইমধ্যে কৃষকরা বিপাকে আছেন। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও শিল্পের ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী সংস্থা বিএমআই সতর্ক করে বলেছে, উৎপাদন খরচের বিপরীতে ফসলের দাম যদি না বাড়ে তাহলে কৃষকদের জন্য খারাপ সময় অপেক্ষা করছে। আবার জমিতে সার ব্যবহারের পরিমাণ কমালে ফলনও কমে যাবে।

প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে আরও বলেছে, এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। বিশেষ করে যেসব দেশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে আছে, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অপরদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হানিয়া ইসাদ বলছেন, এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ার কিছু অংশে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ও বন্যাও হতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ চীনে ধানের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

জলবায়ুর পরিবর্তন কীভাবে এল নিনোর আবির্ভাব এবং এর ব্যাপকতার ওপর প্রভাব ফেলে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন গবেষণামূলক নিবন্ধে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন আগের চেয়ে ঘনঘন তীব্র তাপপ্রবাহ এবং আকস্মিক অতিবৃষ্টির ফলে বন্যা দেখা দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×