রয়টার্সের বিশ্লেষণ
ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন কূটনীতিতে ভাঙনের নেপথ্যে কী
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫টি রাষ্ট্রদূত পদের মধ্যে অর্ধেকই শূন্য
ছবি: বিবিসি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৩:২৫
গত ৭ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’ তখন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক জানতে চেয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবছেন? এই উদ্বেগটি ইউরোপ ও এশিয়াজুড়েও ছড়িয়ে পড়ে। ওই কূটনীতিক বলেন, রাশিয়া এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনেও একই ধরনের হুমকি দেওয়ার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল; যা দুই মহাদেশে একটি পারমাণবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারত।
ইউরোপীয় ওই কূটনীতিকের মতে, তাঁর প্রশ্নের জবাবে মার্কিন কর্মকর্তারা যে অস্বস্তিকর তথ্য দিয়েছিলেন, তা হলো– ‘ট্রাম্প কী বোঝাতে চেয়েছেন বা তাঁর কথার পরিণতি কী হতে পারে, তা তাদের জানা নেই।’ এই ঘটনাটি মার্কিন কূটনীতির এক ঐতিহাসিক ভাঙনকে ইঙ্গিত করে।
মার্কিন দূতাবাস ঘিরে বিশ্বের দেশগুলো এখন আর আগের পরিবেশ পাচ্ছে না। মার্কিন দূতাবাসে বা ওয়াশিংটনের ভেতরে যোগাযোগের স্বাভাবিক মাধ্যমগুলো ভিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫টি রাষ্ট্রদূত পদের মধ্যে অন্তত অর্ধেক এখন শূন্য।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান মনে করেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যাপী মার্কিন সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করছে, যা বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে, চুক্তিতে পৌঁছাতে কিংবা যুদ্ধ এড়াতে আগের মতো কূটনৈতিক পন্থা ব্যবহার করছে না।’
ওয়াশিংটনে জার্মানির সাবেক রাষ্ট্রদূত ভলফগ্যাং ইশিঙ্গার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হচ্ছে ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে। তাঁর সিদ্ধান্ত রাতারাতি বাস্তবায়ন করা হয়।
পেশাদার কূটনীতিকরা কোণঠাসা
যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার কূটনীতিকরা ট্রাম্পের অধীনে কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। এর ফলে মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের আচরণের পদ্ধতি পরিবর্তন করছে। বিদেশি সরকারগুলো দূতাবাস বা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে তারা ট্রাম্পের কিছু ‘অনুগত’ লোকের একটি ছোট বৃত্তকে কেন্দ্র করে কূটনীতি সাজাচ্ছে। মার্কিন পরাশক্তিকে সামাল দিতে অনেক দেশই গোপন চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
অল্প কিছু লোকের ওপর নির্ভর করেন ট্রাম্প
ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতি ক্রমশ মুষ্টিমেয় কয়েকজন দূতের মাধ্যমে প্রবাহিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক বন্ধু স্টিভ উইটকফ। কুশনারের কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদ নেই এবং উইটকফের কোনো কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাও নেই। কিন্তু কিছু বিদেশি সরকার এখন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের চেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। এমনকি কিছু দেশ হোয়াইট হাউসে প্রবেশের জন্য তাদের নিজস্ব পথ তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। জাপান এখন নির্ভর করছে ট্রাম্পের গলফ খেলার সঙ্গী সফটব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মাসায়োশি সনের ওপর।
কর্মী ছাঁটাই করায় কূটনীতিতে সংকট তীব্র
গত বছর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রায় তিন হাজার কর্মী চলে যান, যাদের প্রায় অর্ধেককে বরখাস্ত করা হয় এবং বাকিরা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পরে ডিসেম্বরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ জন রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন, যা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা।
কূটনীতিকদের ইউনিয়ন ‘আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’র তথ্যমতে, বিশ্বের ১০৯টি দেশেই এখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পদে কোনো লোক নেই। নতুন এই কাঠামোর ফলে বিশ্বব্যাপী ওয়াশিংটনের শীর্ষ কূটনীতিকের সংখ্যা কমে গেছে। এমনকি ইরানের সীমান্তবর্তী সাতটি দেশের মধ্যে পাঁচটিতে এবং ছয়টি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যে চারটিতেই কোনো মার্কিন রাষ্ট্রদূত নেই। তা ছাড়া মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা এখন দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। একদল হলো– পেশাদার কূটনীতিক এবং আরেক দল রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত ব্যক্তি।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- ট্রাম্প
- কূটনীতি
