ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ইরান চুক্তি এগিয়ে গেলে কি টলবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

ইরান চুক্তি এগিয়ে গেলে কি টলবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
×

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ১৭:০৮ | আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ | ১৭:২১

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জনসমর্থন সাময়িকভাবে বাড়ালেও দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে খুব একটা পরিবর্তন আনতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নেতানিয়াহু প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারেন। 

২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইসরায়েলি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান একযোগে ইরানে হামলা চালায়, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একে অপরের 'ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত' উদযাপন করেছিলেন। ইসরায়েলের জনগণকে নেতানিয়াহু তখন বলেছিলেন, দুই দেশের জোট কখনও এত ঘনিষ্ঠ ছিল না।

কিন্তু তিন মাস পর, যে সামরিক অভিযানকে যৌথ উদ্যোগ হিসেবে শুরু করা হয়েছিল, তা এখন এমন এক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিচ্ছে যেখানে নেতানিয়াহু কার্যত প্রভাবহীন হয়ে পড়েছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা এড়িয়ে চললেও, আড়ালে ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে-যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ফলাফলে তার প্রভাব খুবই সীমিত।

এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে নেতানিয়াহু বারবার ট্রাম্পকে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করতে চাপ দেন। তার যুক্তি ছিল, ধারাবাহিক চাপেই ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু হোয়াইট হাউস উল্টো পথে এগিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, এখন প্রধানমন্ত্রী আশঙ্কা করছেন যে নতুন চুক্তি ইসরায়েলের মূল উদ্বেগ—ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক-এসবকে যথাযথভাবে সমাধান করবে না, বরং তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ শিথিল করবে।

‘ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া’

এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, নেতানিয়াহু ইরানের তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার পতন ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলেন। তবে তার আশঙ্কা, ইরানের বন্দর অবরোধ শিথিল করা হলে-বিশেষ করে যদি তা কোনো দুর্বল বা অসম চুক্তির অংশ হয়-তাহলে তা কেবল তেহরানকেই স্বস্তি দেবে না, বরং শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

আরেকটি সূত্র আরও সরাসরি জানান, 'এভাবেই মনে হচ্ছে ট্রাম্প আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন।'

লেবানন ইস্যুও এখন বড় চাপের কারণ। ইরান চায় চলমান চুক্তির কাঠামোর মধ্যে লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি যুক্ত করা হোক, যেখানে হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের ওপর ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা এখন নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে-নিজ দলের ভেতর থেকেও এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দিক থেকেও।

মার্কিন আলোচকদের দায় দিচ্ছেন নেতানিয়াহু

২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির সময় নেতানিয়াহু যেভাবে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, এবার সেই দৃশ্য অনুপস্থিত। তখন তিনি সরাসরি কংগ্রেসে গিয়ে চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু এবার ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে এমন প্রকাশ্য বিরোধিতা তার জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

ফলে নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক ভর এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর।

ইসরায়েলি ও মার্কিন আলোচনায় ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তিনি মূলত মার্কিন আলোচক জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, এই দল অর্থনৈতিক সমঝোতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যেখানে ইসরায়েল দেখছে অস্তিত্বগত নিরাপত্তার ঝুঁকি।

একটি সূত্রের ভাষায়, 'ইসরায়েল এতটাই ইরান ইস্যুতে শাসন পরিবর্তনের ধারণায় বিনিয়োগ করেছিল যে তারা বুঝতেই পারেনি-এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অবস্থানও বদলে দিতে পারে।' এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প নিজেও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন, 'বিবি ভালো লোক, সে আমার কথা শুনবে।'

‘নেতানিয়াহু কখন থামতে হয় জানেন না’

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, তার দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক প্রবণতা হলো-সংঘাত শুরু করার পর কখন থামতে হবে, সেই সিদ্ধান্তে দেরি করা। এক সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, 'তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা হলো-সামরিক সাফল্যকে সময়মতো রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে না পারা।'

এর ফলেই ইসরায়েলের সামগ্রিক কৌশলগত অবস্থান উন্নত না হয়ে বরং আরও জটিল হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক চাপ ও জনমত

আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ইরান ইস্যুটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বয়ানকে আরও জটিল করে তুলছে। এক জরিপ অনুযায়ী, ৪৫ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন ইরান পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা মনে করেন, ইসরায়েল হয় এই সংঘাতে জয়ী হয়নি, নয়তো জয়ের পথেই নেই।

ট্রাম্পের ‘ক্ষতিপূরণ’ কৌশল

ইসরায়েলি সূত্রগুলো মনে করে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য ট্রাম্পের উদ্যোগ নেতানিয়াহুর জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ভারসাম্য বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সৌদি আরব এখনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্পষ্ট রোডম্যাপ দাবি করছে, যা ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় বাধা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুধু নির্বাচনী রাজনীতির সীমায় আটকে নেই; এটি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নিজেকে 'ইরান মোকাবিলার দৃঢ় নেতা' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কিন্তু এখন, সামরিক সাফল্য থাকলেও কৌশলগত লক্ষ্য অনিশ্চিত থেকে যাওয়ায়, তাকে এমন এক চুক্তির বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে-যা তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দর্শনকেই গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেবে।
 

আরও পড়ুন

×