ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ ঘটাবে

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ ঘটাবে
×

কোলাজ

মিডল ইস্ট আই

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ১৯:৫৫ | আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ | ২০:১৪

যুদ্ধের প্রভাব বহুমুখী। একটি যুদ্ধ সামরিক ফলাফল ছাড়াও অনেক কিছু ঘটে থাকে। কিছু যুদ্ধের প্রভাবে আঞ্চলিক মেরূকরণ ঘটে। ১৯৯০ সালে কুয়েতে আক্রমণ করে ইরাক। এর প্রভাব আমেরিকান নিরাপত্তা ছাতার অধীনে আরব আঞ্চলিক ব্যবস্থা পুনর্গঠিত করেছিল। আর ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ প্রায় দুই দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই যুদ্ধ অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঢেউ উন্মোচন করেছিল।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধও অনুরূপ ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় অংশীদারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতার সীমা উন্মোচন করেছে। এছাড়াও ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল পরিবেশে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তিকে নতুন ধরনের সমন্বয় অনুসন্ধান করতে প্ররোচিত করেছে।

এই যুদ্ধ সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঐক্যের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আঞ্চলিক সংকটগুলোতে তাদের ক্রমবর্ধমান সমন্বিত অবস্থান ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইথিওপিয়ার মধ্যে বাড়তে থাকা সম্পর্কের সঙ্গে বিরোধী।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো সেই নিরাপত্তা সূত্রের উন্মোচন। যা দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল শাসন করেছিল।

বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলজুড়ে সামরিক ঘাঁটি, প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্কে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটন নিজেকে উপসাগরীয় নিরাপত্তার গ্যারান্টর হিসেবে উপস্থাপন করে। এরপর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ প্রমাণ করল যে, আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতের পরিণতি থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে রক্ষা করতে পারবে না।

এর মানে এই নয় যে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ওয়াশিংটন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে; ভবিষ্যতে এমন কোনো বিকল্প বাস্তবসম্মত নয়। তবে এটা ঠিক, উপসাগরীয় সরকারগুলো তাদের মার্কিননির্ভরতা কমানোর জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসন্ধান করছে।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা

রিয়াদ, আঙ্কারা, কায়রো ও ইসলামাবাদের মধ্যে সমন্বয় এ বিষয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিগুলোর মধ্যে একটি। জোটে সৌদি আরব অর্থনৈতিক সম্পদ প্রদান করে, তুরস্ক উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিক, মিশর সামরিক ও ভূগোলগত গুরুত্ব এবং পাকিস্তান রাজনৈতিক, সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা। তবুও এই উদীয়মান সম্পর্ককে একটি জোট হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না। কারণ, অতীতে এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অবিশ্বাস রয়েছে। এবং তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো সবসময় মিলে না ভিন্ন হয়। 

কাতার অবরোধকে কেন্দ্র করে ২০১৭ সালে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। ২০১৩ সালে মিশরের সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহামেদ মুরসির সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিশর ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে, পাশাপাশি লিবিয়া সংকটও রয়েছে।

একই সময়ে ইসরায়েল এমন একটি নতুন অংশীদারিত্বের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, যা ২০ শতকের মধ্যভাগে অনুসৃত ‘প্রান্তীয় নীতি’ থেকে অনুপ্রাণিত। এই নীতিতে ইসরায়েল আরব বিশ্বকে ঘিরে ফেলতে চেয়েছিল। 

এই নীতির সমসাময়িক পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এর সরঞ্জাম এখন আরও উন্নত, যা আফ্রিকার শিং থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে এই নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ড স্বাক্ষরের পর থেকে আবুধাবি ও তেল আবিবের সম্পর্ক সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে বিস্তৃত হয়েছে। 

ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি জোট গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের যোগদান জোটকে আনুষ্ঠানিক করেছে।

ইতিমধ্যেই ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের একজন প্রধান ক্রেতা: স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৩৪ শতাংশই ভারতের অংশ, যা সেই সময়ের একক বৃহত্তম আমদানিকারক হিসেবে ভারতকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সহযোগিতার নেটওয়ার্ক

গ্রিস ও সাইপ্রাস এই নেটওয়ার্কের পশ্চিমা প্রান্ত গঠন করে। ২০১০ সালে গাজায় সাহায্য বহনকারী মাভি মারমারা জাহাজে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী অভিযানের পর তুর্কি ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর থেকে ইসরায়েল শক্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় উভয় দেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্কগুলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কি প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষার একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি এটি অঞ্চলটিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের দিকে বিস্তৃত অর্থনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

আরও দক্ষিণে ইথিওপিয়া ও সোমালিল্যান্ডও এই পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভূমিকা পালন করছে। ইথিওপিয়া সমুদ্রে প্রবেশাধিকার পেতে অব্যাহত চেষ্টা চালাচ্ছে, আর সোমালিল্যান্ড তার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছে। গাজা যুদ্ধের সময় হুতিদের হামলা ইসরায়েলকে এই অঞ্চলে আরও মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছে, যাতে তারা জাহাজ চলাচলের পথ নিরাপদ রাখতে এবং দক্ষিণ লোহিত সাগর থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলা করতে পারে। 

এসব উন্নয়নের পরেও অঞ্চলটিকে দুটি কঠোর, বিরোধী ব্লকের দিকে এগোচ্ছে বলে বর্ণনা করা বিভ্রান্তিকর হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে, স্থিতিশীল জোট গঠন সবসময়ই একটি কঠিন কাজ। অঞ্চলটিতে পারস্পরিক অবিশ্বাসের উচ্চমাত্রা বিরাজমান। দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের পরিবর্তে নীতিগুলো প্রায়ই সংকট ব্যবস্থাপনা ও স্বল্পমেয়াদী হিসাব-নিকাশের দ্বারা পরিচালিত হয়।

বলা যায়, মিশর সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর পরও আমিরাতের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহায়তার গুরুত্ব বাদ দিতে পারে না। এটি ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিকে একটি কৌশলগত পছন্দ হিসেবেও বিবেচনা করে চলেছে। 

অন্যদিকে, তুরস্ক সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দৃঢ় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছে। এই সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে ফেলার কোনো ইচ্ছ আঙ্কারার নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যা উদ্ভূত হচ্ছে, তা কঠোর জোটের একটি ব্যবস্থা নয়; বরং নমনীয় ও আচ্ছাদিত অংশীদারিত্বের একটি নেটওয়ার্ক।  

রাষ্ট্রগুলো এক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। তারা নিরাপত্তা ইস্যুতে একমত হতে পারে, অন্যদিকে অন্যত্র বিরোধপূর্ণ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুসরণ করতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়তো বিরাট অর্থে নতুন কোনো জোট তৈরি করবে না। 

তবে এটি আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের চলমান প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোকে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসন্ধান করতে বাধ্য করছে। এমন এক সময়ে এটি হলো যখন পুরোনো প্রতিশ্রুতিগুলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে এবং নিরাপত্তা, সম্পদ, সামুদ্রিক পথ, শক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×