মধ্যপ্রাচ্য ফের উত্তপ্ত, জলপথের সংঘাত নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
একটি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। রোববার হরমুজ প্রণালির কাছে। ছবি: এএফপি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৪৬
ফেব্রুয়ারিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর সময় প্রধান কারণ ছিল পারমাণবিক হুমকি। টানা দেড় মাসের সংঘাত এবং তিন মাসের অস্ত্রবিরতির পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখন পাল্টাপাল্টি সংঘাত চলছে সরু জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে।
রোববার একদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে দেশটির ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম)। এগুলোর মধ্যে আছে- প্রণালির নিকটবর্তী বন্দর আব্বাস, সিরিক, চাবাহার, বন্দর-ই দেইর ও জাস্ক শহর।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকালে হরমুজ বন্ধের ঘোষণার পর প্রণালির অনুমোদনহীন রুট দিয়ে চলা একটি জাহাজে গুলি চালায় আইআরজিসি। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও হামলা শুরু করে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাতার, জর্ডান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে ড্রোন হামলা চালায় তেহরান।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় কাতারে তিনজন আহত হয়েছেন। দেশটির কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’র লক্ষণ। অন্যদিকে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি হামলা প্রতিহত করেছে।
হরমুজ ঘিরে আলোচনায় ভূমিকা রাখা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ওমান। রোববার দেশটির উপকূলের কাছে একটি জাহাজে হামলা করে ইরান। বিকেলে ওই যান থেকে ১১ ভারতীয়সহ ২৩ নাবিককে উদ্ধার করা হয়, একজন এখনও নিখোঁজ। ওমানে হামলার বিষয়ে আইআরজিসির দাবি, দেশটির দুকম বন্দরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জ্বালানি সরবরাহ সুবিধা ও নৌযানগুলোর লজিস্টিক সহায়তা কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে।
ওমানে ইরানি হামলার পর মার্কিন দূতাবাস দেশটিতে অবস্থানরত আমেরিকানদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। এদিন বাহরাইনেও বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলার কথা জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
দ্বন্দ্বের উৎস যেখানে
যে সমঝোতা স্মারক মেনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা চলছিল সেটির একটি অনুচ্ছেদ নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে। গত সপ্তাহে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্মারকের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর, ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং ওমান সাগর থেকে পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কেবল ৬০ দিনের জন্য সেখানে কোনো টোল আদায় হবে না।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা মনে করেছিলেন এই অনুচ্ছেদই জাহাজ চলাচল সচল করার মূল চাবিকাঠি এবং পুরো দায়ভার ইরানের ওপর বর্তেছে। অন্যদিকে, ইরানিরা এটিকে জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে লুফে নিয়েছে। জাহাজগুলোকে তাদের নির্ধারিত চ্যানেল দিয়ে চলাচলের দাবি জানাচ্ছে। একইসঙ্গে বার্তা দিয়েছে, নৌযান চলাচলের জন্য এক ধরনের ‘সার্ভিস ফি’ আদায় করা হবে।
এমন অবস্থায় মার্কিন নৌবাহিনী ওমানের কাছাকাছি অন্য একটি চ্যানেল দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা করে। আর তখনই ইরান কয়েকটি নৌযানে গুলি চালায়। ফলাফল হিসেবে জাহাজ চলাচল আবারও স্থবির হয়ে পড়ে। মূলত, এ বিষয়টিই ট্রাম্পকে চরম হতাশ করেছে। প্রতিক্রিয়ায় তিনি যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেন।
রোববার ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ইসনার বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এএফপি। সেখানে সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজাই বলেছেন, কৌশলগত জলপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালি ডজনখানেক পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এটি অবশ্যই রক্ষা করবে।
একইদিন জলপথটি বন্ধের ঘোষণা উপেক্ষা করে সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রণালিটি আন্তর্জাতিক জলপথ, এটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে নেই। সব নৌযানের জন্য এটি উন্মুক্ত আছে। তেহরানের অযাচিত আগ্রাসন, হয়রানি ও হুমকির বিপরীতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে।
মধ্যস্থতাকারীরা যা করছেন
সমঝোতা স্মারকের প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। এ সময় তিনি উভয়পক্ষকে সংযম প্রদর্শন ও উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্স পোস্টের বরাত দিয়ে ডন জানিয়েছে, ফোনালাপে দুই নেতা চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মত বিনিময় করেন। ইসহাক দার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সমঝোতা স্মারকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উত্তেজনা প্রশমনের পথ অনুসরণ করতে জোর তাগিদ দেন।
অপরদিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানও চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। এ সময় তারা দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব আরোপের পাশাপাশি বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিবিড় পরামর্শ ও সমন্বয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন।