সোনম ওয়াংচুক
অনশন কি বদলাতে পারবে ভারতের রাজনীতি
এক ব্যক্তি বদলেছেন ভারতের মানচিত্র
যন্তর মন্তরে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫৫
১৯৫২ সালের অক্টোবরে পত্তি শ্রীরামুলু যখন অনশন শুরু করেন, তখন তিনি এমন একটি দাবি করেছিলেন যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন। দাবিটি ছিল তেলেগু ভাষাভাষীদের জন্য একটি আলাদা রাজ্য। সে সময় ভারতের মানচিত্র পরিবর্তন করতে খাবার ছাড়া টানা ৫৮ দিন সময় লেগেছিল।
শ্রীরামুলু ছিলেন একজন শান্ত স্বভাবের গান্ধীবাদী নেতা, যিনি এর আগেও বিভিন্ন সামাজিক কারণে বেশ কয়েকবার অনশন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল নিজের আত্মত্যাগই দিল্লিকে তাঁর কথা শুনতে বাধ্য করতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছিল। অনশনের ৫৮তম দিনে শ্রীরামুলু মারা যান। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই তেলেগু ভাষাভাষী অঞ্চলগুলোর রাস্তাঘাটে মানুষের ঢল নামে। সরকারি ভবনে হামলা চালানো হয়, রেলপথ অবরোধ করা হয় এবং পরবর্তী সহিংসতায় বেশ কয়েকজন মারা যান।
এর কয়েকদিন পর নেহেরু আলাদা ‘অন্ধ্র রাজ্য’ গঠনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। কয়েক বছরের মধ্যে গঠিত হয় ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ এবং ভাষার ভিত্তিতে ভারতের মানচিত্র নতুন করে তৈরি হয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ের কোনো প্রতিবাদ দেশের ইতিহাসে খুব কমই এমন গভীর ছাপ ফেলেছে। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, পত্তি শ্রীরামুলু আজ এক বিস্মৃত মানুষ। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক, কারণ নিজের দেশের ইতিহাস এবং ভূগোলের ওপর তাঁর প্রভাব মোটেও ছোটখাটো ছিল না।
সম্ভবত এই কারণেই, সাত দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও, ভারতীয়রা স্বভাবগতভাবেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে অনশনের পথ বেছে নেন। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলেন ৫৯ বছর বয়সী শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র শুরু করা ধর্নায় বসে তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন।
বিশ্বের আর কোনো দেশই অনশন বা উপবাসকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ভারতের মতো করে মিশিয়ে নেয়নি। অন্য দেশে আন্দোলনকারীরা রাস্তা অবরোধ করেন বা মিছিল করেন। ভারতীয়রা এসব তো করেই, পাশাপাশি তারা খাওয়া-দাওয়াও বন্ধ করে দেয়। এই চর্চাটি ভারতের প্রজাতন্ত্র হয়ে ওঠার কয়েক শতাব্দী পুরোনো। হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মে স্বেচ্ছায় আত্মত্যাগের একটি গভীর নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
তবে ওয়াংচুকের খালি পেট শেষ পর্যন্ত মানুষের মন পরিবর্তন করতে পারে কিনা, নাকি এটি ব্যর্থ হওয়া আত্মত্যাগের দীর্ঘ তালিকায় আরেকটি নাম হিসেবে যুক্ত হবে, তা তাঁর প্রতিবাদের ভাগ্যই কেবল নয়, বরং ভারতের অন্যতম পুরোনো এই রাজনৈতিক আচারের টিকে থাকার শক্তিও নির্ধারণ করে দিতে পারে।
অনশনের ২০তম দিনে হাসপাতালে সোনম ওয়াংচুক
ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ২০ দিন ধরে অনশনরত পরিবেশকর্মী ও উদ্ভাবক সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। শনিবার ভোরে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে নেওয়া হয়। দিল্লি পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক বর্তমানে সচেতন রয়েছেন এবং তার শারীরিক গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো স্থিতিশীল।
এদিকে যন্তর মন্তরে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে গিয়ে কিছু বিক্ষোভকারী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সামান্য উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে পুলিশ সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। শুক্রবার ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা চিকিৎসকেরা তার অবস্থাকে জরুরি বলে উল্লেখ করেন। তাদের আশঙ্কা, অনশন অব্যাহত থাকলে তার বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে জানানো হয়েছে, গত কয়েক দিনে তার ওজন ৮ কেজির বেশি কমেছে এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।
দুই দিন আগে দিল্লি হাইকোর্ট ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য প্রতিদিন পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন। আদালত বলেন, ‘যেকোনো নাগরিকের জীবনই মূল্যবান।’ একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারকে তার জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওয়াংচুক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশন করছেন। তার অভিযোগ, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। গত কয়েক দিনে কংগ্রেস নেতা পবন খেরা, সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ডিম্পল যাদব এবং আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ বিরোধী দলের কয়েকজন নেতা ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করে তার প্রতি সংহতি জানান। একই সঙ্গে তারা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে অনশন ভাঙার আহ্বান জানান।
যন্তর মন্তরের এই আন্দোলনের আয়োজক অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির দাবি, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে এবং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে।