ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

পাকিস্তানের সিন্ধুতে শিশুদের মধ্যে কেন ছড়িয়ে পড়ছে এইচআইভি

পাকিস্তানের সিন্ধুতে শিশুদের মধ্যে কেন ছড়িয়ে পড়ছে এইচআইভি
×

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছবি: এপি

আল জাজিরা

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১২:২১

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর করাচির একটি সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে অন্তত ১৩০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই শিশু। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, সংক্রমণ প্রতিরোধে অবহেলা, নিরাপত্তাবিধি না মানা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জের ভুল ব্যবহারের মতো নানা অনিয়ম এই সংক্রমণের অন্যতম কারণ হতে পারে।

সিন্ধু প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় ১০ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া করাচির লান্ধি এলাকায় সেসি পরিচালিত আরেকটি কেন্দ্রে আরও ১০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংক্রমণের সূত্রপাত ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে। তবে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ওই বছরের নভেম্বরে, যখন কেবিভি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া কয়েকজন শিশু একসঙ্গে এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য সামনে আসে।

গত ১৪ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে দেওয়া দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় বড় ধরনের গাফিলতির তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়ম মানা হয়নি, সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার ছিল অপর্যাপ্ত এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জও যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি।

প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে ১৬ শিশুর সংক্রমণের কথা উল্লেখ করা হয়। পরে দ্বিতীয় তদন্তে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৭৮ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছয়জন বলে নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনিক ও তদারকির ব্যর্থতার জন্য হাসপাতালের কয়েকজন কর্মীকে দায়ী করা হয়েছে। পরে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়ে অন্তত ১৩০ জনে পৌঁছায়।

এ ঘটনায় হাসপাতালের ৩৭ জন চিকিৎসক ও কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং চাকরি থেকে বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি। তিনি এ ঘটনায় নিজের ‘পরোক্ষ দায়’ও স্বীকার করেছেন।

তবে সংক্রমণের কারণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সিন্ধু হাইকোর্টে করা এক রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের কারণে এইচআইভি ছড়িয়েছে। যদিও শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনির দাবি, হাসপাতালে অটো-ডিজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়, যা দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কিন্তু সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে পাকিস্তানে বার্ষিক এইচআইভি সংক্রমণের হার ২০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজারে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই জানেন না যে তাঁরা আক্রান্ত।

চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট এইচআইভি-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে অনিরাপদ চিকিৎসাপদ্ধতির কারণেই বারবার এইচআইভির প্রাদুর্ভাব ঘটছে। তবে গবেষকেরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে কত মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নজরদারিরও ঘাটতি রয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে সিন্ধু প্রদেশে ৮৯৪ জন নতুন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩২৯ জনই শিশু। পাকিস্তান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ সিরিঞ্জের খুচরা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ২০০ কোটি রুপির তহবিল গঠন, আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার স্বাধীন নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের দুর্বল তদারকি, অনিরাপদ চিকিৎসাচর্চা এবং রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ইনজেকশননির্ভর চিকিৎসার প্রবণতা পরিবর্তন না হলে এ ধরনের সংক্রমণ ঠেকানো কঠিন হবে।

আরও পড়ুন

×