ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি হলো নতুন ভাইরাস

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি হলো নতুন ভাইরাস
×

ছবি: বিবিসি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৫:৩১

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন এবং পরীক্ষাগারে বংশবিস্তার করতে সক্ষম ভাইরাস তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটাই প্রথমবারের মতো এআই পুরো একটি ভাইরাসের জিনোম নকশা করেছে, যা বাস্তবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি জৈবনিরাপত্তা ও অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণার ফলাফল বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকেরা জানান, এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা ১৬টি নতুন ভাইরাস পরীক্ষাগারে সফলভাবে ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। এগুলো ব্যাকটেরিওফাজ বা সংক্ষেপে ফাজ, অর্থাৎ এমন ভাইরাস যা কেবল নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই বিবিসিকে বলেন, এটি জেনারেটিভ এআইয়ের সক্ষমতার এক নতুন ধাপ। আগে এআই দিয়ে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো একটি সম্পূর্ণ জিনোম নকশা করা হয়েছে, যা নিজে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে এবং কোষের ভেতরে কার্যকরভাবে কাজ করে।

গবেষকেরা ইভো–১ ও ইভো–২ নামে দুটি এআই মডেল ব্যবহার করেন। ভাষাভিত্তিক এআই যেমন পরবর্তী শব্দ অনুমান করে, তেমনি এই মডেলগুলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ ও মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন জিনগত বিন্যাস তৈরি করে। এরপর গবেষকেরা সম্ভাবনাময় ৩০২টি নকশা পরীক্ষাগারে তৈরি করেন। এর মধ্যে ১৬টি ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে সফল হয়।

গবেষক স্যামুয়েল কিং বলেন, পরীক্ষাগারে ব্যাকটেরিয়ার স্তরের ওপর ফাজ প্রয়োগ করার পর যখন পরিষ্কার দাগ দেখা যায়, তখনই তারা বুঝতে পারেন নতুন ভাইরাসগুলো কাজ করছে। ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর গবেষণাগারে উপস্থিত বিজ্ঞানীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে করতালি দেন।

গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকে অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি সতর্কবার্তাও এসেছে। সায়েন্স–এ প্রকাশিত এক মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির গবেষক থমাস ইংলেসবি ও মরিটজ হ্যাঙ্কে বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তি জৈবনিরাপত্তা ও জৈবসুরক্ষা নিয়ে জরুরি প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, এখন আর প্রশ্ন এআই দিয়ে ভাইরাস তৈরি সম্ভব কিনা- বরং প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে যাতে তা গুরুতর ক্ষতির কারণ না হয়।

তারা বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেন, মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করতে পারে- এমন নতুন ভাইরাস তৈরির গবেষণা করা উচিত নয়।

এদিকে স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরা জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা গবেষণা পরিচালনা করেছেন। প্রশিক্ষণ ডেটা থেকে মানুষ বা অন্যান্য জটিল প্রাণীকে সংক্রমিত করতে পারে- এমন ভাইরাস বাদ দেওয়া হয়েছিল। পুরো গবেষণাই উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন পরীক্ষাগারে পরিচালিত হয়েছে।

ব্রায়ান হাইয়ের মতে, যথাযথ নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই প্রযুক্তি মানবস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তার ভাষ্য, নতুন ওষুধ, জিনভিত্তিক চিকিৎসা এবং নানা ধরনের জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবনে এআই ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

স্পেনের পম্পেই ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনথেটিক বায়োলজির অধ্যাপক মার্ক গুইয়েল এই গবেষণাকে ‘বিজ্ঞান জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, প্রথমবারের মতো কম্পিউটারে বসেই নতুন জীববৈজ্ঞানিক নকশা তৈরির যুগ শুরু হলো।

আরও পড়ুন

×