ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিউমার্কেটের হোটেলগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, অগ্নিকাণ্ডে সামনে এলো নানা অনিয়ম

নিউমার্কেটের হোটেলগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, অগ্নিকাণ্ডে সামনে এলো নানা অনিয়ম
×

ছবি-সংগৃহীত

কলকাতা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৩৬ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৪১

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ও সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর ঘিঞ্জি এ এলাকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে ১৫জি, মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লাগে। রাত তখন প্রায় আড়াইটা। অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুনের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ঘন কালো ধোঁয়া। এতে হোটেলের ভেতরে আটকা পড়া অনেকেই শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক এবং দুজন ভারতের।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, হোটেলটিতে অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। ফায়ার লাইসেন্স না থাকা, দীর্ঘদিন অগ্নিনিরাপত্তা অডিট না হওয়া এবং জরুরি সময়ে বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের তথ্যও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, জরুরি বহির্গমনের পথ দেওয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

আগুনের সূত্রপাতের কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে এসির শর্টসার্কিটকে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে আগুনের কারণ বলা যাচ্ছে না।

ঘিঞ্জি এলাকায় অসংখ্য হোটেল

নিউমার্কেট এলাকা কলকাতার বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। কলিন স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিটসহ আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিদেশি পর্যটকদের অভিযোগ, এসব হোটেলের অনেকগুলো পুরোনো ও ঘিঞ্জি ভবনে গড়ে উঠেছে। কোথাও সরু করিডর, কোথাও অপর্যাপ্ত সিঁড়ি, আবার কোথাও জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা নেই। অনেক ভবনে বৈদ্যুতিক তারও অপরিকল্পিতভাবে ঝুলতে দেখা যায়। কয়েক দশক পুরোনো লিফট ও সংকীর্ণ চলাচলের পথও অনেক হোটেলের সাধারণ চিত্র।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হোটেলগুলোর সৌন্দর্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হলেও অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে অতিথিদের বের করে আনার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। ফলে আগুন বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

‘আর এক মিনিট হলেই আমিও মারা যেতাম’

অগ্নিকাণ্ডের সময় ‘শিখা ইন’ হোটেলের পাঁচতলায় ছিলেন গাজীপুরের বাসিন্দা মো. আসাদুজ্জামান। কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে বেরিয়ে আসেন তিনি।

আসাদুজ্জামান বলেন, আগুন লাগার পর পরনের গেঞ্জি দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে কোনোরকমে হোটেল থেকে বের হয়ে আসেন। তাঁর ভাষায়, ‘আর এক মিনিট হলেই আমিও হয়তো মারা যেতাম।’

রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্ন

হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কলকাতার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও।

বিজেপির কনভেনার নবীন মিশ্র অভিযোগ করেন, আগের বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সময়ে অনেক আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, অবৈধ হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শুরুরও দাবি জানান তিনি।

সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমও নিউমার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা ও অন্যান্য কাজে কলকাতায় আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো দুর্ঘটনার পর শুধু দোষারোপ না করে এর কারণ খুঁজে বের করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সেলিম আরও বলেন, পুরসভা, দমকল বা পুলিশের কোনো পর্যায়ে দুর্নীতি থাকলে অর্থের বিনিময়ে বেআইনি স্থাপনা বা ব্যবসা চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

তবে নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলের ম্যানেজার দাবি করেছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

মর্গে ৯ মরদেহ

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নয়জনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ ও দমকল বিভাগ। হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইসেন্স, ভবনের কাঠামো এবং আগুনের সূত্রপাতসহ সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×