নেপালে বন্যা ও ভূমিধসের কারণ কী, এত প্রাণহানি কেন
নেপালে পাহাড়ি ঢলে একটি ঘর তলিয়ে গেছে। ছবি: রয়টার্স
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ০২:১৭ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ০২:২৬
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭ দাঁড়িয়েছে। পর্যটকসহ আরও অন্তত ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। চীন-নেপাল সীমান্তের একটি নদীর দুই কূল উপচে তীব্র স্রোতে নেমে আসে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু ভবন কাদামাটি ও পানির নিচে চাপা পড়ে। সেখানে আটকে পড়াদের সন্ধানে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নেপাল পুলিশের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসকবলিত এলাকাগুলো থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় একজন, নুয়াকোটে ১১ জন, ধাদিংয়ে ১৮ জন, চিতওয়ানে ৩৩ জন, গোর্খায় ১৯ জন, তানাহুঁতে সাতজন এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এখনও পর্যন্ত ৩৮৪ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ এই পর্যটকদের মধ্যে ২৯১ জনই বিদেশি। নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা রয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণ কী। আর এই দুর্যোগে এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটলো কেন?
বন্যা ও ভূমিধসের কারণ কী
এবারে এ বন্যা ও ভূমিধসকে ২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে। ঠিক কী কারণে হঠাৎ এমন বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, বুধবার তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্পের পরই এর সূত্রপাত।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, ভূমিকম্পটি হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে। এর ৩ মিনিটের মাথায় অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘তবে এটা আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রায়ই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ এবং ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে।
দ্রুত আরেকটি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং। তিনি এএফপিকে বলেন, নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।
এত প্রাণহানি কেন
নেপালে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্লেকরা বলছেন, ভূমিকম্পটি হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে। এর ৩ মিনিটের মাথায় অর্থাৎ, ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। চীন-নেপাল সীমান্তের একটি নদীর দুই কূল উপচে তীব্র স্রোতে নেমে আসে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু ভবন কাদামাটি ও পানির নিচে চাপা পড়ে। সেখানে আটকে পড়ার কারণে প্রাণহানি বেশি হয়েছে।
দেশটির পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র পানির তোড়ে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে দেখা যায়, কাদামাটির নিচ থেকে একটি বাড়ির শুধু ওপরের অংশটি দেখা যাচ্ছে।
নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে তাদের প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, এই দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশের একজন মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে তারা সতর্ক করেছেন। নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা উপদ্রুত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলাকর্মী মোতায়েন করেছে।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, আকস্মিক এই বন্যায় তিব্বতের গিরংয়ে তিনজন মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৬৫ জন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ‘ব্যাপক হতাহতের’ ঘটনা ঘটেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ উদ্ধার অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয়দের বর্ণনা
আকস্মিক বন্যায় স্বজন হারানো এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নেপালের নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা কল্পনা মাল্লা জানান, তার বাবা, মা, বোন এবং বোনের সন্তানরা চোখের সামনে বন্যার পানিতে ভেসে যান।
তিনি বলেন, তারা বন্যা থেকে বের হতে পারেননি। কোনো সুযোগই ছিল না। বন্যা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তবে আমি ও আমার ছেলে একটি বাড়ির ছাদে উঠে প্রাণে বেঁচেছি। কীভাবে বেঁচে গেলাম, তা-ই বুঝতে পারছি না।
কল্পনার ছেলে সুগাম মাল্লা জানান, মায়ের হাত ধরে তিনি নিরাপদে যান। বন্যার আগে তিনি তার মোবাইল ফোনটি বোনের কাছে দিয়েছিলেন, যাতে প্রয়োজনে সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু এখন বোনের ফোন বন্ধ। তার আশঙ্কা, বোন হয়তো বন্যার পানিতে ভেসে গেছেন।
নেপালের রাসুয়া জেলার স্যাফ্রু বেসি গ্রামের বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ট্রেকিং গাইড সোনাম দর্জিও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে তাঁর গ্রামে আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। তবে এর এক ঘণ্টা আগেই তিনি একটি কাজে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তাঁর বোন দেচেন তামাং, ভগ্নিপতি এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য এখনো নিখোঁজ।
গ্রাম ছাড়ার সময় তিনি বন্যার ভয়াবহ শব্দ শুনতে পান। তিনি বলেন, মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। আমার বাড়ি ধসে গেছে।
সোনাম দর্জি বন্যাকে ‘হঠাৎ ও ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন। তার মতে, অনেক মানুষ এখন ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। তাদের জরুরি উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়া, খাবার, অস্থায়ী আশ্রয় এবং চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন। বোনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা এখনো ছাড়েননি সোনাম। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, তাকে জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো ১০ শতাংশ।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার ঘটনায় তার হৃদয় ভারাক্রান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি এই দুর্যোগকে ‘আকস্মিক’ ও ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেন।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, উদ্ধার অভিযান শুরু করতে সরকার কোনো ধরনের বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি, কাঠমুন্ডু টাইমস, এএফপি ও রয়টার্স
- বিষয় :
- নেপাল
- বন্যা
- বন্যায় মৃত্যু
- বন্যা পরিস্থিতি