রয়টার্সের বিশ্লেষণ
হিমবাহ ভেঙে পড়ার কারণেই হয়তো নেপালে বন্যা-ভূমিধস
ছবি: এএফপি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪৩ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১২:২৬
প্ল্যানেট ল্যাবস-এর স্যাটেলাইট চিত্র উদ্ধৃত করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হিমবাহ ভেঙে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার কারণে নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক এবং ভূ-বিজ্ঞানী ড্যান শুগার জানিয়েছেন, ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার ফলে নেপালের আকস্মিক বন্যা হয়ে থাকতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, চিত্রগুলো দেখে মনে হচ্ছে বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ বরফ গলে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘উপত্যকার কিছু হিমবাহ গতকাল বরফে ঢাকা ছিল এবং আজ সেগুলোতে বেশিরভাগই শুধু খালি বরফ (বেয়ার আইস) দেখা যাচ্ছে। অন্যভাবে বলতে গেলে সম্ভবত তখন আবহাওয়া উষ্ণ ছিল। যদিও আমি এখনও কোনো আবহাওয়া স্টেশনের ডেটা দেখিনি।’
২০২৩ সালে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। সংস্থাটি ওই বছর আরও যোগ করে, বিশ্বের প্রধান দুই কার্বন নির্গমনকারী দেশ— ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় গত দশকে ৬৫ শতাংশ দ্রুত গলেছে।
শুগার বলেন, ‘প্ল্যানেট ল্যাবসের আজকের সকালের স্যাটেলাইট চিত্রে আমি যা দেখতে পাচ্ছি, তাতে একটি হিমবাহের নিচের অংশ প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় ভেঙে পড়ে এবং প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘নির্মাণকাজও এর একটি কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভূমিকা পালন করেছে কি না, তা আমরা নিঃসন্দেহে অদূর ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখব।’
হিমবাহটি ঠিক কী কারণে ধসে পড়েছে তা স্পষ্ট নয়, তবে নেপালি কর্মকর্তারা কয়েক মিনিট আগে ওই অঞ্চলে হওয়া একটি ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা প্ল্যানেট ল্যাবস থেকে পাওয়া ওই অঞ্চলের আগের ও পরের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সবুজ পাহাড়ের ঢাল এখন বাদামি রঙের ধ্বংসাবশেষ ও পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা ইঞ্জিনিয়ারিং জিওলজি বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্তা বলেন, এটি নিশ্চিত যে ওই হিমবাহের সম্মুখভাগের (গ্লেসিয়ার স্নাইউট) একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধসে পড়ায় এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। এর সঙ্গে সম্ভবত প্রচুর পরিমাণে পাথর এবং পলিও যুক্ত ছিল।
বরফ-পাথরের ধস
প্রায় ৫০ হাজার জনসংখ্যার পার্বত্য জেলা রাসুয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ) জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্ত ক্রসিংয়ের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হওয়া একটি ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে এই হিমবাহ-যুক্ত বন্যা দেখা দিয়েছে।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে এমনও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্পের কারণে তুষারধস ও বন্যা শুরু হয়ে থাকতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষের ভূতাত্ত্বিক প্রকাশ পোখারেল জানিয়েছেন যে এই কারণেই ট্র্যাজেডিটি ঘটেছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট-এর (ইসিমোড) মতে, হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চল জুড়ে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস এবং খরার তীব্রতা ও প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অঞ্চল জুড়ে পানি, ভূমি ও বাতাসের দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জন্য একটি বড় হুমকি তৈরি হচ্ছে।
ইসিমোড জানিয়েছে, আকস্মিক এই বন্যার ফলে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থা দিয়ে পানি, পলি এবং পাথরের এক শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসে। তারা আরও জানায়, ভাটির দিকে গালচছি এলাকায় নদীর পানির স্তর মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ৯ মিটার (৩০ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে যায়।
উল্লেখ্য, নেপালের রাসুয়া জেলা ও এর আশেপাশে হওয়া আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় ৪০৩ পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালি পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৬৪ জনের মরদেহ চিতওয়ান জেলার ভাটির দিকের বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং ২৬ জনের মরদেহ নাওয়ালপরাসি ইস্ট এলাকায় উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
- বিষয় :
- নেপাল
- ভূমিধস
- আকস্মিক বন্যা