ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

প্রতিবেশী

নেপালের নদীগুলো কেন অবকাঠামোর জন্য ফাঁদ?

নেপালের নদীগুলো কেন অবকাঠামোর জন্য ফাঁদ?
×

ছবি- নেপাল ফটো লাইব্রেরি

সন্দীপ জোশী

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪৩ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৪৪

উত্তর রসুয়ার ভোটেকোশী নদীর তলদেশের দিকেই তাকানো যাক। ২৬ আগস্ট বুধবার সকালে হঠাৎ ১০ মিটার উঁচু এক পানির দেয়াল তিমুরে আর স্যায়াব্রুবেসির ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এই দুর্যোগ বহু জনপদ গুঁড়িয়ে দেয়, কাস্টমসের অবকাঠামো তছনছ করে, পুলিশ পোস্ট উপড়ে ফেলে, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং প্রধান বাণিজ্য পথের ওপর সদ্য নির্মিত ব্রিজগুলো তছনছ করে দেয়। কাঠমান্ডুর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সরকারি প্রতিবেদনে নিশ্চিতভাবেই এটিকে ‘নজিরবিহীন হাইড্রোলজিক্যাল প্লাবন’ বলে চালিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু যখন দশকের মধ্যে একই জায়গায় বারবার এমন ঘটনা ঘটে, তখন এটাকে 'আকস্মিক দুর্ঘটনা' বলাটা আসলে দুর্বল পরিকল্পনা আর দূরদর্শিতার অভাব ছাড়া কিছুই নয়।

আমরা এমন এক জলবায়ুর জন্য দেশ গড়ে তুলছি, যার বাস্তবে আর কোনো অস্তিত্বই নেই। কাঠমান্ডুর যেকোনো কৌশলগত দলিল ঘেঁটে দেখুন— সেটি কোনো জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাই হোক, সড়ক সম্প্রসারণের নীল নকশাই হোক বা দাতা সংস্থাসমূহের অর্থায়নে চলা গ্রামীণ জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্পই হোক—সবখানেই গড় প্রবণতাকে মান হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। পরিকল্পনাবিদরা তাদের সব মডেল তৈরি করেন বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত, ভিত্তিরেখার গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং নদীর গড় পানি প্রবাহের হিসাব মেপে। কাগজে-কলমে মানচিত্র বা নকশা তৈরি করার সময় এই ‘গড়’ হিসাবটা চমৎকার এক স্বস্তি দেয় বটে। এতে পাঁচ বছরের প্রকল্প বাজেটে একটা সুনির্দিষ্ট, স্বস্তিদায়ক অনুমানের দাগ টেনে দেওয়া সহজ হয়। কিন্তু নেপালের ভূগোলের মেজাজ এই 'গড়' হিসাবের তোয়াক্কা করে না।

রসুয়ার কোনো পাহাড়ের ঢাল এমনি এমনি ধসে পড়ে না, কিংবা ত্রিশূলী করিডোরের কোনো সেতুর মূল ভিত্তি স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে ভেঙে পড়ে না। এগুলো ধসে পড়ে কারণ উঁচু পর্বতের কোনো জলাধার বা হিমবাহ হুট করে ফেটে গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার টন পানি সংকীর্ণ গিরিখাতে পড়ে গেলে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন মানে কিন্তু শুধু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রা সামান্য কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যাওয়া নয়। এর আসল প্রভাব দেখা যায় এই তীব্রতায়, যা কাঙ্ক্ষিত গড় মাত্রা থেকে ধ্বংসাত্মক চরম বিপর্যয়কারী ঘটনার দূরত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

হিসাবের এই ব্যবধান বুঝতে না পারাটা মূলত মৌলিক পরিসংখ্যানের চরম ব্যর্থতা। নেপালের প্রচলিত প্রকৌশলবিদ্যা সব সময় ঐতিহাসিক গড়ের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। ৩০ বছরের গড় বন্যা পরিস্থিতি কিংবা বর্ষার গড় পানি প্রবাহ। কিন্তু নেপালের মতো চঞ্চল ও স্পর্শকাতর ভূপ্রকৃতিতে এই গড় দিয়ে আসলে দরকারি কিছুই বোঝা যায় না। আসল ঝুঁকিটা লুকিয়ে থাকে স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন  থেকে, যা মেপে দেখায় কোনো চরম দুর্যোগ স্বাভাবিক গড় থেকে কতটা ভয়ংকরভাবে ছিটকে যেতে পারে।

আপনি যখন কোনো নদীর ওপর কংক্রিটের সেতু কিংবা বাঁধের সড়ক কেবল গড় হিসাব মাথায় রেখে বানাবেন, তার মানে দাঁড়ায় আপনি মূলত বছরের ৯০ শতাংশ দিন যে শান্ত পরিবেশ থাকে, তার জন্য জিনিসটা বানাচ্ছেন। কিন্তু অবকাঠামো তো শান্ত দিনে ভেঙে পড়ে না। এটি ভেঙে পড়ে যখন কোনো বড় পরিসংখ্যানগত ব্যতিক্রম বা স্ট্যান্ডার্ড-ডেভিয়েশনের মতো চরম ধাক্কা এসে হানা দেয়। যা কিছু গড় সামলানোর জন্য বানানো হয়েছে, নিয়মের বিধানেই তা নদীর তীব্র গতি আসার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে যাওয়ার জন্য তৈরি।

পরিসংখ্যানের এই অন্ধত্ব আমাদের কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে স্থানীয় সবপর্যায়ের সরকারি বাজেট ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ধাক্কা পৌঁছায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, যা তাঁদের সামাজিক ও সামাজিকভাবে এমনভাবে পঙ্গু করে দেয় যে, আবার ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখনই অতিরিক্ত তারতম্যযুক্ত তীব্র ঝড় বা হিমবাহ নিঃসৃত হ্রদ ফেটে পানি আসে, তার প্রবাহ স্বাভাবিক ঐতিহাসিক মধ্যক বা গড় ধরে বানানো অবকাঠামোকে নিমেষেই ভাসিয়ে নেয়। ড্রেন উপচে পড়ে, কালভার্ট ভেঙে যায় আর প্রতিরক্ষা দেয়াল গড়িয়ে নদীর বুকে বিলীন হয়। প্রতি শরতে ঠিক একই জায়গায়, ঠিক একই গড়ে তৈরি নকশায় বারবার সেতু বানিয়ে যাওয়া মানে স্রেফ জীবনের ঝুঁকি বাড়ানো আর সরকারি অর্থের অপচয়।

এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের সার্বিক সরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় তিনটি স্পষ্ট পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, ভৌত অবকাঠামো ও পরিবহন মন্ত্রণালয়কে পাহাড়ি এলাকার মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের ক্ষেত্রে গড়ভিত্তিক সবধরনের হিসাব-নিকাশ আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। স্থানীয় রাস্তা থেকে শুরু করে মহাসড়কের সেতু পর্যন্ত সমস্ত সরকারি অবকাঠামোর নকশা বাধ্যতামূলকভাবে উঁচু মানক বিচ্যুতি বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদনের আগে ঐতিহাসিক গড় বৃষ্টিপাতের বদলে হঠাৎ আসা বিপুল পানির চাপ সামলানোর ১০০ বছরের তারতম্য বা ভ্যারিয়েন্স মডেলে ফেলে সেটির স্ট্রেস-টেস্ট করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং আঞ্চলিক পরিকল্পনাবিদদের তাঁদের প্রকল্প মূল্যায়নের মাপকাঠি পুরোপুরি বদলাতে হবে। যেসব কর্মসূচিতে বলা হয় নদীর তীর রক্ষা করা গেছে বা গড় মৌসুমি তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় অর্থনীতি ১৫ শতাংশ বেড়েছে— ছয় মাস পর একটি চরম ধাক্কায় যদি পুরো উপত্যকা ধ্বংস হয়ে যায়, তবে সেই অর্জন শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। মূল্যায়নের ভিত্তি হতে হবে চরম তারতম্য সামলানোর সক্ষমতা। অর্থাৎ প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদী স্থির গড়ের কাল্পনিক অর্জনের গল্প না শোনায়, বরং চরম দুর্যোগের সময় অবকাঠামো কতটা টিকে থাকতে পারছে—তা দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।

সর্বশেষ, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণের কাজ থেকে সরে এসে পূর্বাভাস-ভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে সম্পদ নিয়োজিত করতে হবে। নদী আটকে যাওয়া পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে থেকে তারপর জরুরি তহবিল নামানো একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অকার্যকর কৌশল। যখনই তীব্র আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা উজান থেকে পানি নেমে আসার সংকেত পাওয়া যাবে, সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্বাভাসভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ ও সতর্কবার্তা চালু হতে হবে, যেন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ দুর্যোগ আসার আগেই অন্তত তাঁদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত করতে পারেন।

নেপালের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য নিশ্চয়ই প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, তবে শুধু ভূগোলের দোষে কিন্তু আমাদের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে না। আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থার মূল গলদ হলো— আমাদের পরিকল্পনাবিদরা এখনও একটি শান্ত ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ধরে নিয়ে নকশা বানাতে ভালোবাসেন, যার বাস্তব অস্তিত্ব আর নেই। আমরা বহুবার এর করুণ পরিণতি দেখেছি।

যে সেতু বা অভিযোজন নীতি ৯৯টি স্বাভাবিক দিনে চমৎকার কাজ দেয়, নদীর আসল স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন বা তাণ্ডবরূপ প্রকাশের ১টি দিনেই যদি তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে— তবে সেই কাঠামোর কোনো মূল্যই নেই। তাই এখনই সময়, আমাদের পরিকল্পনাকে গড় হিসাবের চিন্তা থেকে বের করে চরম দূর্যোগ মোকাবিলার ধারণায় নিয়ে যাওয়া এবং তথাকথিত নজিরবিহীন আর ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলোর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা, যা বাস্তবে মোটেও নজিরবিহীন নয়।

সন্দীপ জোশী: পরিবেশ বিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষক; দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×