ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

সাদা কালো

উগ্রবাদের উত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য

উগ্রবাদের উত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৫ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক কিছু সংস্কৃতিবিরোধী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই বলা শুরু করেছেন, আমাদের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হয়ে আসছে। তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যারা কিছুদিন আগেও এখানে উগ্রবাদের প্রসার ঘটার কথা স্বীকার করতেন না। তাদের কেউ এতে বিশেষত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অভিসন্ধি খুঁজতেন। কেউ কেউ, এমনকি হাজার বছরের সিনক্রিয়েটিস্টিক বা সমন্বিত ধর্ম ও সংস্কৃতিচর্চার উদাহরণ তুলে ধরে বেশ আশ্বস্ত করার সুরে বলতেন, লালন-হাসনের মতো অসংখ্য বাউল সাধক ও লোককবির চারণভূমি এ দেশ কখনোই উগ্রবাদের দখলে যাবে না। 

কিন্তু ঘটনা তো একটা-দুটো নয়; ধারাবাহিকভাবে ঘটেই চলেছে। আর কোন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে না? গানের আসর, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কনসার্ট, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি উৎসব, এমনকি ধর্মীয় উৎসবও রেহাই পাচ্ছে না। কয়েকশ বছর জমকালো মিছিল ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হয়ে আসছে। এবার বহুস্থানেই এমন কিছু করা হলে ‘তৌহিদী জনতা’ বাধা দেওয়ার আগাম হুমকি দিয়ে রেখেছে। দেশের অনেক এলাকায় মাজারে ওরস বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি মাজারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সেই সঙ্গে পীরকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারা হয়েছে। মৃত পীরের লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। 

যে সুফিবাদী ধারাকে এ দেশে ইসলাম প্রচারের পুরোধা হিসেবে মনে করা হয়; বহুস্থানে তাদের আসর বা জলসা ‘তৌহিদী জনতা’র বাধায় হতে পারছে না। নবী-রাসুল তথা বিভিন্ন ইসলামী সাধকের জীবনের নানা ঘটনা গানে গানে বিতর্কের মাধ্যমে যে আলোচনা করে গ্রামাঞ্চলে কবিয়াল ও বয়াতিরা মানুষদের ইসলাম সম্পর্কে ধারণা দিতেন, সেগুলোও অনেকাংশে বন্ধ। বলা হচ্ছে, এগুলো শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খোদ পুলিশ লাইন্সে ঢুকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড করা হয়েছে। রাষ্ট্রের যে বাহিনী জনগণের উৎসব-পার্বণ পালনের অধিকারকে সুরক্ষা দেবে, সে বাহিনীই আক্রান্ত হওয়ার পর আর কী বাকি থাকে? শুধু তাই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘গানবাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে…নিষিদ্ধ’ থাকার কথা বলেন (দৈনিক ইত্তেফাক, ২২ আগস্ট), তখন তো রাষ্ট্রের লাগাম কার হাতে– সে প্রশ্নই ওঠে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে যখন এসব তাণ্ডব শুরু হয়, তখন অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি প্রথমে এগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমনও ব্যাখ্যা হাজির করেন– যে কোনো ‘বিপ্লবের পর’ এমনটা দেখা যায়। অভ্যুত্থানের পর পর দেশের কিছু স্থানে হিন্দুদের মন্দিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাহারা দেওয়ার ছবি প্রচার করে তারা বোঝাতে থাকেন– উগ্রতাই এখানে শেষ কথা নয়। তদুপরি বাস্তবে যখন ২০২৫ সালজুড়েই নানা স্থানে নারীর পোশাক নিয়ে হেনস্তার পাশাপাশি পাগল বেশে ঘুরে বেড়ানো মানুষদের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটে; সেই সঙ্গে মাজার ভাঙা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ডের ঘটনা ঘটে– তখন বলা হলো, অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ মহলের প্রতি পক্ষপাত থেকে এগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। নির্বাচিত সরকার এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

সম্ভবত সেই প্রেক্ষাপটে, জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামবাদী দলগুলোর ক্ষমতারোহণ ঠেকাতে উদার চিন্তার ভোটারদের এক বিরাট অংশও, যারা ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগকে ভোট দিত– বিএনপিকে ভোট দেয়। বাস্তবে পরিস্থিতির ইতরবিশেষ ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে না। স্পষ্ট বোঝা গেল, ওইসব হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্প্রীতির বুনন, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এ উদার গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানার মতো তাণ্ডবগুলো একান্তই অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয় নয়। বরং এগুলো একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।

অনস্বীকার্য, তৌহিদী জনতার ব্যানারে রাষ্ট্রীয় ও লোকজীবনের নানা কিছুকে ‘বেদাত’ বা ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, এমনকি হামলা-ভাঙচুর আমরা দেখে আসছি। তবে গত দুবছর ধরে ওই প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ যে বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে, তা নজিরবিহীন। অনেক এলাকায় হামলাকারীরা শুধু নিজেদের ইসলামের অভিভাবকই দাবি করছে না; দণ্ডমুণ্ডের কর্তাও হয়ে বসে আছে। 
বস্তুত ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে আশির দশকজুড়ে ক্ষমতাসীন মহলের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এ ধারার ধর্মীয় শক্তিগুলো বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী থেকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। অন্যদিকে ধর্মীয় উগ্রপন্থার প্রবল প্রতিপক্ষ বলে পরিচিত বামপন্থিরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের অভিঘাতে এবং ভুলনীতি-কৌশলের কারণে ক্ষয়িষ্ণু ধারায় পরিণত হয়েছে। এমনকি নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বা সেক্যুলার দাবি করা দল আওয়ামী লীগও সহজে ক্ষমতায় যাওয়া বা তা ধরে রাখার নেশায় ধর্মবাদী দলগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। এই সবকিছুরই ফসল বর্তমান পরিস্থিতি। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এখানকার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে, সে প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদের উত্থান সম্ভবত সহজ হয়ে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সময়ে এদেশে যে কটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল; দেড় দশক আগে পর্যন্ত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সেগুলোও বিশেষত উদারমনা রাজনীতির ওই ক্ষয়ের সঙ্গী হয়েছে। তাদের কেউ যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, কেউ ক্ষমতার সঙ্গী হয়ে এক প্রকার পরজীবীতে রূপান্তরিত। উদারপন্থি শিবিরের এই ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে রক্ষণশীল ধারা, পরে উগ্রবাদের পথ সহজ করে দিয়েছে।

নির্বাচনের আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন– ‘বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে।’ অন্তত বিএনপি সরকারের গত ছয় মাসের কর্মকাণ্ড তার সাক্ষ্য বহন করে না। তারা মবতন্ত্রের বিরুদ্ধে বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন; বাস্তবে গত ছয় মাসে মব সহিংসতা কমেনি। এ সহিংসতা বরং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও হীনস্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তথৈবচ।


উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণের কোনো ইচ্ছা ক্ষমতাসীনদের আছে বলে মনে হয় না, যদিও তা এক পর্যায়ে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর উদাহরণ রয়েছে। এ অবস্থায় গণতন্ত্রমনা এবং সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে বিশ্বাসী মানুষেরা এগিয়ে এলে একটা উপায় হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তমত, উদার ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রশ্নে গত দুবছরে ব্যাপক মানুষের মধ্যে যে ইতিবাচক, এমনকি কোথাও কোথাও প্রতিরোধমূলক মনোভাব দেখা গেছে, সেটাকে সংহত করা গেলে উগ্রবাদের উত্থান মোকাবিলা সম্ভব হতেই পারে। কিন্তু সেই লক্ষণ কি দেখা যাচ্ছে? 

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×