ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিকে দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে হবে

সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিকে দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে হবে
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে আটকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল করতে এর প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার এই মানসিক সংকট কাটিয়ে ওঠা জরুরি। আমরা দেখেছি, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি তথা ডিসিইউতে ১৬ মার্চ নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত অধ্যাদেশকে ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ডিসিইউ আইনে পরিণত করা হয়। আইনটি পাস হওয়ার পর সেখানে গত মাসে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এমনিতেই বিলম্বিত ভর্তি পরীক্ষায় সেশনজট ছাড়াও নানামুখী সংকট নিয়ে ডিসিইউর যাত্রা। সেখানে পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নতুন করে বড় হয়ে উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। যদিও এই সংকটে ঘি ঢেলেছেন খোদ উপাচার্য নিজেই। তিনি যেভাবে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তা নতুন করে পুরোনো দ্বন্দ্ব সামনে নিয়ে এসেছে। 

সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সংকটের সূচনা ২০১৭ সালে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ভোগান্তি ও সেশনজটের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন করতে হয়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়; শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসেন। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করেন এবং গত বছর এসে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের জন্য ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। বস্তুত গত বছরই সাত কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরকার তখন সব কলেজকে বাদ দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার এক রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। শিক্ষার্থীদের একাংশও তার পক্ষে মাঠে নামে। সংগত কারণেই আমরা তার বিরোধিতা করেছিলাম। শিক্ষকরাও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। সাত কলেজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা ও শিক্ষার সুযোগ যাতে সংকুচিত না হয়, সে জন্য সমকালেই আমি দুটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। 

বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ, তারা কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার পক্ষেই আইনটি পাস করেছে। তারপরও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সংকট কাটেনি। একদিকে আইন অনুসারে যেসব অবকাঠামো ও শিক্ষার উন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তা দেখা যাচ্ছে না। অপরদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পুরোনো সেই মতানৈক্য এখনও কাটেনি। তা ছাড়া সেখানে পুরোনো পদ্ধতিতেই চলছে পাঠদান। ইতোমধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ, মানে নতুন করে ভর্তির সময় এলেও গত ব্যাচের ভর্তি কার্যক্রমই শেষ হয়নি। এখানে সেশনজটসহ একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির মূল ক্যাম্পাস ও প্রশাসনিক ভবন কোথায় হবে, তাও ঠিক হয়নি। একই সঙ্গে সাত কলেজের যেসব শিক্ষার্থী শেষ পর্যায়ে আছেন তাদের শিক্ষাজীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হবে, নাকি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধীনে হবে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মতানৈক্য দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এখানেও স্পষ্ট। 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি– এই দীর্ঘ সময়ে সাত কলেজে অনেক সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উচিত কলেজগুলোকে আস্থায় নিয়ে পথচলা। অথচ হঠাৎ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত শিক্ষকদের নিয়ে ডিসিইউর ভিসি যে মন্তব্য করেছেন, তা শিক্ষকদের সংক্ষুব্ধ করেছে। প্রতিবাদের মুখে উপাচার্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ডিসিইউর ওয়েবসাইটে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন বটে, তারপরও মনের ক্ষত কতটা ঘুচবে? এখানে উল্লেখ্য, ২২ আগস্ট ডিসিইউর উপাচার্য যখন মন্তব্য করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের যে চিন্তা-চেতনা ও গবেষণা থাকা দরকার, সেটি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নেই– তার পরদিনই দেখা গেল বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা ১৩ দফা দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, যার প্রথম দফায়ই বলা আছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয় উপযোগী’ শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু হয়েছে, কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তার আগেই বিদ্যমান শিক্ষকদের ব্যাপারে এমন ধারণা কাম্য নয়। উপাচার্য কিংবা শিক্ষার্থী কারও বিসিএস ক্যাডারের শিক্ষকদের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব থাকা উচিত নয়। ইতিবাচক বিষয় হলো, উপাচার্যের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে শিক্ষকরা নিজেরাই সাত কলেজের শিক্ষকদের একাডেমিক ও পেশাগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি যাতে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও কার্যক্রম গ্রহণ করে তার তাগাদা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠানে হাজারো সমস্যা থাকলেও জনশক্তির মধ্যে ঐক্য তার সমাধান খুব সহজেই সম্ভব করে তুলতে পারে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিরও যেসব সমস্যা আছে, সেগুলোর ব্যাপারে নিজেরা পরামর্শ করলে সহজ সমাধান বেরিয়ে আসবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবার আন্তরিকতাই যথেষ্ট।

মনে রাখতে হবে, সাত কলেজ নিয়েই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি এসেছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও গবেষণার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে। এই উন্নয়নে উপাচার্যের ভূমিকা অনেক। নেতৃত্বের আসনে থেকে তাঁকে সকল অংশীজনের ব্যাপারে সুধারণা রাখতে হবে। এখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরও পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলতে হবে। শিক্ষকদের যেমন শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে উদার হওয়া জরুরি, তেমন শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে। এখন যেহেতু ইউনিভার্সিটি হয়ে গেছে, চাইলে তারাই নিজেদের প্রচেষ্টায় শিক্ষা ও গবেষণায় শ্রেষ্ঠত্ব আনতে পারবে।

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]


 

আরও পড়ুন

×