ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

কৃষি খাত

১৮০ দিনের অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ

১৮০ দিনের অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ
×

শাইখ সিরাজ

শাইখ সিরাজ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মূল ভিত হয়ে উঠতে থাকে শিল্পনির্ভর অর্থনীতি। শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রযন্ত্র যতটা আন্তরিক ছিল, কৃষি ততটা গুরুত্ব পায়নি; কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও। কৃষকের উৎপাদন শুধু খাদ্য চাহিদা পূরণের অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছে। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাত। যে কৃষক রাতদিন পরিশ্রম করে দেশের মানুষের মুখে অন্ন জোগান দেন, তিনিই বহু বছর ধরে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত; কৃষি উপকরণ সহজে না পেয়ে দিশেহারা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে সবচেয়ে অসহায়। 

দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিবছর আমরা আয়োজন করি ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন জেলায় আয়োজিত সে অনুষ্ঠানে সাধারণত কোনো গ্রামের খোলা মাঠে কৃষকদের মুখোমুখি বসেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কর্তাব্যক্তি ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের সামনে মুক্তকণ্ঠে কৃষক নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন।

দেশের খাদ্যঝুঁকি সামলানো সেই কৃষক তাঁর ঘামে ভেজা ফসলের ন্যায্যমূল্য, যথাসময়ে মানসম্মত সার ও কীটনাশক, নির্ভরযোগ্য সেচ সুবিধা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও শস্যবীমা পাওয়ার প্রশ্নে সবসময়ই অবহেলিত ও উপেক্ষিত। কৃষক সবসময়ই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেছেন সহজে কৃষিঋণ পাওয়ার অধিকার; ফল-ফসলের নিরাপত্তার জন্য শস্যবীমা, পেশার মর্যাদা ও স্বীকৃতি।

সরকার ঘোষিত ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসন এবং কৃষি খাতকে আধুনিক ও টেকসই কাঠামোতে দাঁড় করানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। ছয় মাস একটি খাতের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে স্বল্প সময়ে গৃহীত উদ্যোগগুলো দেশের কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু সহনশীল ও কৃষককেন্দ্রিক করে তোলার সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ও তার সুদ মওকুফের সিদ্ধান্তটি ছিল ঐতিহাসিক। প্রায় ১২ লাখ কৃষক এর ফলে মোট প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল পেয়েছেন। কেবল ঋণ মওকুফই স্থায়ী সমাধান নয়। কৃষক যেন সহজ শর্তে নতুন করে ঋণ পেতে পারেন এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর শোষণ ছাড়াই সরকারি সহায়তা লাভ করতে পারেন, তার জন্য প্রয়োজন আমূল প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ২০২৬-২৭ ঘোষণা করেছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ৫৩.৮৫% বেশি। এটিও আশাজাগানিয়া খবর।

কৃষকের নিখুঁত তথ্যের অনুপস্থিতি এতদিন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা পৌঁছানোয় সবচেয়ে বড় বাধা ছিল। কার কতটুকু জমি আছে; তিনি কী ফসল ফলাচ্ছেন; কী ধরনের বালাইনাশক বা সার ব্যবহার করছেন কিংবা দুর্যোগে কার ক্ষয়ক্ষতি বেশি, এসব তথ্য  সঠিকভাবে না থাকায় সরকারি প্রণোদনা অনেক সময় প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছাত না। ১৮০ দিনের কর্মসূচির বিশেষ অগ্রাধিকার ছিল কৃষক কার্ড বিতরণ ও ডিজিটাল তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা।

গত পহেলা বৈশাখে সর্বজনীন কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তিনি কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ এবং কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক খাতে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।

যা হোক, দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয়ভাবে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ কৃষকের সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে সরকারি ভর্তুকি, সার ও বীজ, পরিষেবা সরাসরি নিবন্ধিত কৃষকের কাছে পৌঁছাবে। এতে কৃষি খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা বহুলাংশে কমে আসবে। অবশ্য উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ে নিরপেক্ষ তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত হালনাগাদ এবং তথ্যের সঠিক ব্যবহারের ওপর।

সেচ মৌসুমে পানির তীব্র সংকট এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতা কৃষকের নিত্যসঙ্গী। নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো যেভাবে খাল ও জলাধার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশকেও সেই পথে হাঁটতে হবে। ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে সেচ ব্যবস্থার আমূল সংস্কারে খাল খনন ও পুনর্খননকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। জাতীয়ভাবে ছয় হাজার কিলোমিটার কৃষি খালের বিপরীতে প্রথম ধাপে নির্ধারিত ৪৭৮.৯ কিলোমিটার লক্ষ্যমাত্রার ৯৯.৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে দৃশ্যমান ও বড় অর্জন। তবে কেবল খনন করলেই চলবে না; খালগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। খালগুলো যেন একই সঙ্গে সেচ, মাছ চাষ, পানি সংরক্ষণ ও অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনে সমন্বিত ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য কৃষি সেচ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এগুলো কার্যকর রাখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কৃষকের মাসের পর মাসের খাটুনি ও পুঁজি ধ্বংস করে দেয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা খরার পর নিঃস্ব কৃষকের জন্য কেবল মানবিক সাহায্যই যথেষ্ট নয়। এই ঝুঁকি স্থায়ীভাবে মোকাবিলার কার্যকর হাতিয়ার শস্য বীমা। ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেটে’ কৃষকরা বরাবরই শস্য বীমা চালুর দাবি তুলে এসেছেন। সরকার যে শস্য বীমা চালুর রূপরেখা ও খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তা আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষির অন্যতম রক্ষাকবচ হতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও গ্রামীণ এলাকার সবুজায়নে ২৫ লাখ বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে ভূমিকা রাখবে।

১৮০ দিনের পথচলায় সার সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা এবং ক্ষতিকর বালাইনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে নীতিগত পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফসল ফলানোর বিশেষ উদ্যোগ, মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের মাধ্যমে পচনশীল ফসলের অপচয় রোধ, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং জৈব সার উৎপাদনে তৃণমূল উদ্যোক্তা তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া সহনশীল বীজের উদ্ভাবন ও কৃষকের কাছে মসৃণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষি গবেষণায় গতি আনা হয়েছে।
এত সম্ভাবনার মাঝেও বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রথমত, কৃষক যদি ফসলের ন্যায্য দাম না পান; কোনো আধুনিক প্রযুক্তিতেই তাঁকে কৃষিতে ধরে রাখা যাবে না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষক থেকে বাজার যোগসূত্র তৈরি করা এখনও বড় পরীক্ষা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে প্রযুক্তিগত সংস্কার মাঠ পর্যায়ের কৃষকের কাছে কতটা সহজবোধ্য ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে যান্ত্রিক কৃষির বিকল্প নেই। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৃহৎ কৃষিযন্ত্রের তুলনায় ক্ষুদ্র কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার সংকট সমাধানে কার্যকরী। তাই কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র কৃষিযন্ত্রকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। আগামীর পরিকল্পনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা জরুরি।
১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচিকে আরও এগিয়ে নিতে হলে নীতিগত স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা জরুরি। তাহলে দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব। আর কৃষির ভবিষ্যৎ কেবল খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করলে চলবে না। পরিমাপ করতে হবে কতটুকু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদিত হলো, মাটি ও পানি কতটা সুরক্ষিত রইল। সর্বোপরি কৃষক কতটা স্বাবলম্বী ও সম্মানিত হলেন। কৃষি খাত প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই রূপান্তরে এগিয়ে যেতে হলে আগামী দিনে কৃষিনীতির মূল কেন্দ্রে রাখতে হবে কৃষককেই।

শাইখ সিরাজ: কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×