ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

বিজ্ঞানীরা কি রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের কণা আবিষ্কার করেছেন?

বিজ্ঞানীরা কি রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের কণা আবিষ্কার করেছেন?
×

একটি গবেষণাগারে লাক্স-জেপেলিন ডার্ক ম্যাটার পরীক্ষার মূল ডিটেক্টর। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটায়। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

আল জাজিরা

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৪১ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৪৪

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের পার্বত্য এলাকা ব্ল্যাক হিলস। এটি বহু বছরের পুরোনো একটি সোনার খনির জন্য পরিচিত। সম্প্রতি তরল জেনন ভর্তি একটি ট্যাংক ব্যবহার করে সেখানে অস্বাভাবিক কণার বিক্রিয়া ঘটানো হয়েছে। ‘ডার্ক ম্যাটার’ এর রহস্য উন্মোচনে এই বিক্রিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

পরীক্ষা চালানো বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা কণার এমন একটি মিথস্ক্রিয়া দেখেছেন যা ব্যাখ্যা করার মতো নয়। এটিকে ডার্ক ম্যাটারের কণার মতো মনে হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।

‘ডার্ক ম্যাটার’ ও ‘ডার্ক এনার্জি’ হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে দুর্বোধ্য দুটি পদার্থ। মানুষ এগুলোর অস্তিত্বের বিষয়ে ধারণা পেলেও সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি।

ডার্ক ম্যাটার কী?
এটি এমন এক অদৃশ্য পদার্থ, যা মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ২৭ শতাংশ বলে ধারণা করা হয়। একইভাবে, মহাবিশ্বের মোট উপাদানের ৬৮ শতাংশ হলো ডার্ক এনার্জি। এর প্রভাবে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথগুলো পরস্পরের কাছে থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। এটি মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের গতিকেও বাড়িয়ে দেয়।

আমরা সাধারণ যেসব পদার্থ দেখতে বা স্পর্শ করতে পারি, সেগুলো মহাবিশ্বের বিদ্যমান সবকিছুর মাত্র ৫ শতাংশ।

বিজ্ঞানীরা গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন এবং বড় গুচ্ছের চারপাশে আলো বেঁকে যাওয়ার ওপর মহাকর্ষীয় টানের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেটি করতে গিয়ে তারা এই অদৃশ্য পদার্থের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পান। কিন্তু এই পদার্থ কী দিয়ে তৈরি এবং দেখতে কেমন তা আজও রহস্য হয়ে আছে। কারণ, ডার্ক ম্যাটারে আলো বা তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ প্রতিফলিত হয় না। ফলে এটি সরাসরি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

কক্ষপথে নাসার ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের’ একটি ইলাস্ট্রেশন। আল জাজিরার সৌজন্যে

ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় ১৯৩০-এর দশকে। সে সময় সুইস জ্যোতির্বিদ ফ্রিটজ জুইকি লক্ষ্য করেন, কোমা ক্লাস্টারের গ্যালাক্সিগুলো খুব দ্রুত গতিতে চলছে। যেটিকে ক্লাস্টারের দৃশ্যমান ভর দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। এ থেকে তিনি ধারণা করেন, সেখানে নিশ্চয়ই অন্য কোনো পদার্থ মহাকর্ষীয় টান প্রয়োগ করছে।

পরবর্তী কয়েক দশকেও একই ধরনের বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এসব পর্যবেক্ষণ ইঙ্গিত দেয় মহাবিশ্বে অদৃশ্য কোনো পদার্থের উপস্থিতি আছে।

রোববার যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছে, তারা ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প চালু করছে। ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ’ নামের এই প্রকল্পে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি নিয়ে গবেষণা করা হবে।

সবশেষ পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা কী পেয়েছেন?
৩৮টি প্রতিষ্ঠানের ২৫০ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর একটি দল ‘লাক্স-জেপেলিন’ বা এলজেড নামে একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। পরীক্ষাটি চালানো হয় সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের স্যানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফ্যাসিলিটি-এর একটি ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে। এতে অতি বিশুদ্ধ তরল জেনন আছে। চারপাশে স্থাপন করা হয়েছে আলোর উপস্থিতি শনাক্তের শত শত সেন্সর।

তত্ত্ব অনুযায়ী, জেনন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যদি ‘উইক্লি ইন্টার‌্যাক্টিং ম্যাসিভ পার্টিকল (ডব্লিউআইএমপি)’ নামের কাল্পনিক ডার্ক ম্যাটারের বিক্রিয়া হয়, তাহলে একটি পর্যায়ে আলোর দুটি ঝলক তৈরি হতে পারে। সবশেষ পরীক্ষায় এই তত্ত্বটি যাচাই করা হয়েছে।

এলজেড দলের সদস্যরা ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২২০ দিনের তথ্য পর্যালোচনা করেছেন। এতে দেখা গেছে, পরীক্ষা চলার সময় ২০২৩ সালের ১৬ জুন আলোর ঝলক শনাক্ত হয়েছে। 

পরীক্ষার এই ফলাফল গত মঙ্গলবার জাপানে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে তুলে ধরেন গবেষক দলের প্রধান ও ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী স্যাম এরিকসেন। তিনি বলেন, এই পরীক্ষায় ব্যতিক্রম যে ঘটনাটি শনাক্ত হয়েছে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

এলজেড-এর মুখপাত্র ও ব্রাউন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ রিক গেইটস্কেল বলেন, আবিষ্কারটি নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী না হওয়াই ভালো। কারণ, ‘আমরা ডার্ক ম্যাটার দেখেছি’- এমন দাবি করার সুযোগ এখনো আসেনি।

এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
পদার্থবিদরা বলছেন, এখন পর্যন্ত এলজেড পরীক্ষায় পাওয়া সংকেতগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে জোরালো। পদার্থবিদ্যার জ্ঞানের কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়- এমন একটি কণার অস্তিত্ব প্রমাণের পথ দেখাতে পারে এই সংকেত। 

গবেষণাটিতে কাজ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব সিডনির পদার্থবিদ থেরেসা ফ্রুথ। তিনি এবিসি নিউজকে বলেছেন, ঘটনাটি বেশ আশাব্যঞ্জক। কারণ, এটি কয়েকবার পরীক্ষা করা হয়েছে এবং প্রতিবারই একই ফল পাওয়া গেছে। 

থেরেসা ফ্রুথ বলেন, ‘অনেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও এই ঘটনাটি কোনোভাবেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে না।’

আরও পড়ুন

×